সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় এক কলেজছাত্রীকে উত্ত্যক্ত ও কুপ্রস্তাব দেওয়ার প্রতিবাদ করায় তার বাবাকে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধরের অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার তিন দিনের মাথায় ওই কলেজছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
নিহত কলেজছাত্রী নীলা খাতুন (নাম পরিবর্তন করা হয়নি) উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের ধুলান্ডা গ্রামের বাসিন্দা। সোমবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় নিজ বাড়ি থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরিবারের অভিযোগ, মেয়েকে উত্ত্যক্ত ও কুপ্রস্তাব দেওয়ার প্রতিবাদ করায় প্রথমে তার বাবাকে মারধর করা হয়। এ ঘটনায় আহত বাবা একই দিন তালা থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। কিন্তু অভিযোগের পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি পরিবারের। এর কয়েক দিনের মধ্যেই নীলার মৃত্যু হয়।
তবে পুলিশের দাবি, লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছিল। নীলার মৃত্যুর ঘটনায় ইতোমধ্যে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
কলেজে যাতায়াতের পথে উত্ত্যক্তের অভিযোগ
নিহতের পরিবারের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে কলেজে যাতায়াতের পথে নীলাকে উত্ত্যক্ত ও কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন প্রতিবেশী রকি শেখ (২৪), শোয়েব মালী (১৮) ও ইমন শেখ (২২)।
বিষয়টি জানার পর নীলার বাবা লিটন শেখ অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। মেয়েকে উত্ত্যক্ত না করতে এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি তাদের একাধিকবার অনুরোধ করেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পরিবারের দাবি, এরপরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং নীলাকে নিয়ে এলাকায় নানা ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছিল এবং তাকে বাড়ির বাইরে না যাওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।
বাড়িতে গিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ
পরিবারের অভিযোগ, গত ১ অক্টোবর অভিযুক্তরা নীলাদের বাড়িতে গিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের না হওয়ার জন্য হুমকি দেন। একই সঙ্গে তাকে নিয়ে এলাকায় অপপ্রচার চালানোর অভিযোগও করেছে পরিবার।
এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে প্রতিবেশী আমজেদ শেখের মেয়ে আকলিমা খাতুনের সঙ্গে নীলার বাগ্বিতণ্ডা হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এর পরদিনই ঘটে আরও গুরুতর ঘটনা।
বিদ্যুতের খুঁটিতে বেঁধে বাবাকে মারধরের অভিযোগ
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, ২ অক্টোবর দুপুরে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে লিটন শেখকে ধরে নিয়ে একটি বাড়ির উঠানে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়।
এ ঘটনায় আমজেদ শেখ, রকি শেখ, শোয়েব মালী, ইমন শেখ, ইমরান ও আকলিমা খাতুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
বাবাকে মারধরের খবর পেয়ে নীলা ও তার মা দেলোয়ারা বেগম সেখানে গেলে তাদেরও মারধর করা হয় বলে পরিবারের দাবি।
ঘটনার পর আহত লিটন শেখ সেদিনই তালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বক্কর সিদ্দিকীর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগের তিন দিন পর মেয়ের মৃত্যু
পরিবারের দাবি, থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এরপরও নীলা ও তার পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ তাদের।
এর তিন দিনের মাথায় সোমবার সন্ধ্যায় নীলার নিজ ঘর থেকে ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন—নীলা আত্মহত্যা করেছেন, নাকি তাকে হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে?
তবে এ প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিত নয়। পুলিশ তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের করার কথা জানিয়েছে।
‘পা মাটিতে স্পর্শ করছিল, ফাঁসের দাগও দেখিনি’
নীলার মামা সাদ্দাম হোসেন দাবি করেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় নীলার পা মাটিতে স্পর্শ করা অবস্থায় ছিল। তার গলায় ফাঁস লাগার স্বাভাবিক দাগও তারা দেখতে পাননি বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, নীলার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি ঘরে পাওয়া যায়নি। ফোনে কল করলে রিং হচ্ছে, কিন্তু কেউ ফোন ধরছে না।
সাদ্দাম হোসেনের সন্দেহ, নীলাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার পর মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর পুলিশ যদি দ্রুত ব্যবস্থা নিত, তাহলে হয়তো তার ভাগ্নিকে এভাবে হারাতে হতো না।
তবে পরিবারের এসব বক্তব্য এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। ময়নাতদন্ত, ঘটনাস্থলের আলামত, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
পুলিশের বক্তব্য কী?
পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তালা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আক্তারুল ইসলাম।
তিনি বলেন, লিটন শেখের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছিল।
নীলার মৃত্যুর ঘটনায় সোমবার রাতেই আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে একটি মামলা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
তবে আগের অভিযোগের পর পুলিশ কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল, অভিযুক্তদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছিল কি না এবং পরিবারকে নিরাপত্তা দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ও এখন তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি মানবাধিকারকর্মীর
ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন মানবাধিকারকর্মী মাধব চন্দ্র দত্ত।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা ও বিচারের আশায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে নিহতের পরিবার অভিযোগ করছে। মৃত্যুর পর আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা হয়েছে। কিন্তু নীলা আত্মহত্যা করেছেন, নাকি তাকে হত্যা করে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করা জরুরি।
তার মতে, শুধু নীলার মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করলেই হবে না; মৃত্যুর আগে পরিবার যে অভিযোগ থানায় দিয়েছিল, সেই অভিযোগের পর পুলিশের ভূমিকা কী ছিল, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
দায়িত্ব পালনে কারও অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
তদন্তেই বের হবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ
নীলার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এখন দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, কলেজছাত্রীকে উত্ত্যক্ত ও কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ এবং এর প্রতিবাদ করায় তার পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগ। দ্বিতীয়ত, থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে নীলার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা।
মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত, মরদেহের অবস্থান, গলায় আঘাত বা ফাঁসের চিহ্ন, মোবাইল ফোনের কল ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে আগের লিখিত অভিযোগের পর পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল, তারও নথিভিত্তিক পর্যালোচনা প্রয়োজন।
এ ঘটনায় পরিবারের অভিযোগগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নারী ও কিশোরীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

