বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলা পরিষদের ছয়টি উন্নয়ন প্রকল্পে মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে দুই দফায় মোট এক কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের (এলজিইডি) দুটি পৃথক সরকারি প্রজ্ঞাপনে প্রথমে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৫০ লাখ এবং পরে ২০২৬ সালের মে মাসে আরও ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যেসব প্রকল্পে দ্বিতীয় দফায়ও বরাদ্দ দেখানো হয়েছে, সেসব প্রকল্পের অধিকাংশের দৃশ্যমান বাস্তবায়নের কোনো স্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি। এতে সরকারি অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপজেলা-২ শাখা থেকে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর জারি করা প্রজ্ঞাপনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) উপজেলা উন্নয়ন সহায়তা খাত থেকে আদমদীঘি উপজেলার ছয়টি প্রকল্পে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পগুলোর মধ্যে ছিল উপজেলা কৃষি অফিস পর্যন্ত আরসিসি সড়ক নির্মাণ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সরকারি বাসভবনের রাস্তা সংস্কার, উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক ভবন ও পুরোনো প্রশাসনিক ভবনের মেরামত এবং যমুনা ও রূপসা আবাসিক ভবনের সংস্কার।
এরপর ২০২৬ সালের ১০ মে সংশোধিত এডিপির আওতায় একই বিভাগের আরেকটি প্রজ্ঞাপনে আবারও ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দুই প্রজ্ঞাপনের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভাষাগত কিছু পরিবর্তন ছাড়া প্রকল্পগুলোর ধরন প্রায় অভিন্ন। ফলে একই প্রকল্পে দ্বিতীয়বার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
প্রথম প্রজ্ঞাপনে কৃষি অফিস পর্যন্ত আরসিসি সড়ক নির্মাণের কথা উল্লেখ থাকলেও দ্বিতীয় প্রজ্ঞাপনে কৃষি অফিসের সামনের রাস্তা মেরামতের কথা বলা হয়েছে। একইভাবে ইউএনওর সরকারি বাসভবনের রাস্তা সংস্কারের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ রাস্তা সংস্কারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রশাসনিক ভবন, পুরোনো প্রশাসনিক ভবন এবং যমুনা ও রূপসা আবাসিক ভবনের সংস্কার—দুই প্রজ্ঞাপনেই প্রায় একইভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

মাঠে গিয়ে মিলল না উন্নয়ন কাজের চিহ্ন
সরেজমিনে আদমদীঘি উপজেলা পরিষদ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সরকারি নথিতে যেসব স্থাপনায় সংস্কার বা উন্নয়ন কাজের কথা উল্লেখ রয়েছে, সেসব স্থানে সাম্প্রতিক কাজের দৃশ্যমান কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। কৃষি অফিস সংলগ্ন সড়ক, ইউএনওর সরকারি বাসভবনের প্রবেশপথ, প্রশাসনিক ভবন, পুরোনো প্রশাসনিক ভবন এবং যমুনা ও রূপসা আবাসিক ভবনে নতুন কার্পেটিং, কংক্রিট ঢালাই বা রং করার কোনো চিহ্ন নেই। বরং বিভিন্ন ভবনের দেয়ালে শ্যাওলা, খসে পড়া পলেস্তারা, আগাছা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার চিত্রই চোখে পড়ে।
উপজেলা প্রশাসনের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোমানা আফরোজের দায়িত্বকালে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রশাসনিক ভবনসহ কয়েকটি স্থাপনায় উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হয়েছিল। এরপর একই স্থাপনায় আবার দুই দফায় নতুন বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে নেই, তবু চলছে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বর্তমানে উপজেলা পরিষদ চত্বরে দক্ষিণ ও পূর্ব পাশের সীমানা প্রাচীর পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে। কোথাও নির্মাণসামগ্রী স্তূপ করে রাখা হয়েছে, কোথাও চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৬ সালের মে মাসে জারি করা সরকারি কোনো প্রজ্ঞাপনেই সীমানা প্রাচীর নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণের জন্য বরাদ্দের উল্লেখ নেই।
ফলে বর্তমানে যে কাজটি বাস্তবায়ন হচ্ছে, সেটি কোন প্রকল্পের আওতায় এবং কোন বরাদ্দ থেকে পরিচালিত হচ্ছে—সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
.jpg)
এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের দাবি, দ্বিতীয় দফায় তারা ভিন্ন প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় সরকার বিভাগ ভুলবশত আগের প্রকল্পগুলোর নামেই বরাদ্দ অনুমোদন দেয়। তবে এ দাবির পক্ষে তারা কোনো সংশোধিত প্রজ্ঞাপন, নতুন প্রকল্প তালিকা কিংবা আগের বরাদ্দ বাতিলসংক্রান্ত সরকারি নথি দেখাতে পারেনি।
উপজেলা প্রকৌশলী রিপন কুমার সাহা বলেন, গত ১৫ জুন চারটি কার্যাদেশের মাধ্যমে মোট ৮৬ লাখ ৭৯ হাজার ২০১ টাকার কাজ দেওয়া হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো ৩০ জুনের আগেই কাজ শেষ করে বিল উত্তোলন করেছে।
কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমএস অর্পা কনস্ট্রাকশনের মালিক আনোয়ার হোসেন রোমানও দাবি করেন, কার্যাদেশ পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যেই জুন ক্লোজিংয়ের আগে তিনি পুরো বিল উত্তোলন করেছেন।
নতুন প্রশ্নের জন্ম
তবে সরকারি প্রজ্ঞাপনে যে ছয়টি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দের কথা উল্লেখ রয়েছে, বাস্তবে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে তালিকার বাইরের কিছু কাজেও। এতে একই প্রকল্পে দুই দফা বরাদ্দের পাশাপাশি অনুমোদিত প্রকল্প পরিবর্তনের অভিযোগও সামনে এসেছে।
স্থানীয়দের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে জনমনে আস্থার সংকট আরও বাড়বে। তারা বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, বরাদ্দ, কার্যাদেশ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নসংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

