ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬

menu

শ্রমিক আন্দোলনে নাশকতার অভিযোগ, গোয়েন্দা তদন্তে আ’লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের নাম

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২৬, ১০:২৯ এএম

শ্রমিক আন্দোলনে নাশকতার অভিযোগ, গোয়েন্দা তদন্তে আ’লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের নাম

ছবিঃ সংগৃহীত

তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও অন্যান্য অধিকার আদায়ের দাবিতে চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য (এমপি) এবং সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মীর অনুপ্রবেশ ও নাশকতায় জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আওয়ামীপন্থি ব্যবসায়ীদের মালিকানাধীন গাজীপুরের অন্তত ১০টি পোশাক কারখানার নাম এসেছে। এসব কারখানা থেকে আন্দোলনে ইন্ধন জোগানোর অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অন্যান্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক শ্রমিক কারখানায় কাজ করতে আগ্রহী হলেও তাঁদের আন্দোলনে যোগ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনের আড়ালে অন্য কোনো পক্ষ পরিস্থিতিকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলন

ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা আন্দোলনে নামেন। বেতন বৃদ্ধি, চাকরির নিরাপত্তা, শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষেত্রে ন্যায্য পরিবেশের দাবিও রয়েছে তাঁদের আন্দোলনে।

এক সপ্তাহ ধরে চলা আন্দোলন ধীরে ধীরে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও কর্মবিরতি, কোথাও কারখানার সামনে অবস্থান এবং কোথাও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। কিছু এলাকায় পরিস্থিতি সহিংস রূপ নেওয়ায় শিল্পকারখানার উৎপাদন ও স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার রোববার নতুন মজুরি নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এর ফলে শ্রমিকদের বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে মজুরি বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলন অব্যাহত থাকা এবং বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটায় আন্দোলনের নেতৃত্ব ও এর পেছনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

আন্দোলনে শ্রমিকদের বাধ্য করার অভিযোগ

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের একটি অংশ কারখানায় ফিরে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে চাইলেও আন্দোলনে অংশ নিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কেউ কেউ আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন, কিন্তু কেন বা কার নির্দেশে আন্দোলন হচ্ছে, সে বিষয়ে তাঁদের স্পষ্ট ধারণা নেই বলেও দাবি করা হয়েছে।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া জানিয়েছেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক শ্রমিকই তাঁদের অংশগ্রহণের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে জানেন না।

এ ধরনের তথ্য আন্দোলনের পেছনে সাধারণ শ্রমিকদের দাবি ছাড়াও অন্য কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে গাজীপুরের ১০ কারখানার নাম

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে গাজীপুরের অন্তত ১০টি পোশাক কারখানার নাম এসেছে বলে জানা গেছে। এসব কারখানার মালিকদের আওয়ামীপন্থি ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কারখানাগুলোর কোনো কোনো পক্ষ শ্রমিক আন্দোলনে ইন্ধন জোগাচ্ছে।

এ ছাড়া মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মীর অনুপ্রবেশের তথ্য পাওয়া গেছে বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি।

তবে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নাম আসা মানেই সংশ্লিষ্ট কারখানার মালিক বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিক আন্দোলন এবং পরিকল্পিত নাশকতার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করাও জরুরি।

শ্রমিকের ছদ্মবেশে নাশকতার অভিযোগ, গ্রেপ্তার ৪০

এদিকে পোশাকশ্রমিকের ছদ্মবেশে নাশকতার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অন্তত ৪০ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা ও নাশকতার অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিস্তারিত, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং মামলার বর্তমান অবস্থা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও তদন্তের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও শিল্পের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এ খাতে দীর্ঘস্থায়ী শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা, রপ্তানি আদেশ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও অন্যান্য অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকদের প্রকৃত দাবিকে উপেক্ষা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে শ্রমিক আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কোনো রাজনৈতিক বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সহিংসতা ও নাশকতা চালালে তা শিল্প খাতের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকপক্ষ ও সরকারের কার্যকর সংলাপ জরুরি। একই সঙ্গে আন্দোলনে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ, শ্রমিকদের জোর করে বিক্ষোভে অংশ নিতে বাধ্য করা এবং নাশকতার অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে পোশাকশিল্পের চলমান শ্রমিক আন্দোলন এখন শুধু মজুরি বৃদ্ধির দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ, নাশকতার অভিযোগ এবং শিল্পের নিরাপত্তার প্রশ্ন। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!