ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬

menu

পোশাক শ্রমিকদের নতুন মজুরি দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস মালিকপক্ষের, কাজে ফেরার আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২৬, ১২:৪২ পিএম

পোশাক শ্রমিকদের নতুন মজুরি দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস মালিকপক্ষের, কাজে ফেরার আহ্বান

ছবিঃ সংগৃহীত

তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্বিবেচনা ও নতুন মজুরি কাঠামো দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন পোশাকশিল্পের মালিকদের দুই সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নেতারা। একই সঙ্গে চলমান আন্দোলন-বিক্ষোভ প্রত্যাহার করে শ্রমিকদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার এবং শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

মালিকপক্ষের নেতারা বলেছেন, নবগঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ড ইতিমধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে। মজুরি পুনর্বিবেচনার জন্য সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। বোর্ডের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নে কারখানার মালিকরা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন।

বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এবং বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

দ্রুত এগোচ্ছে মজুরি পুনর্বিবেচনার কার্যক্রম

সংবাদ সম্মেলনে পোশাকশিল্পের নেতারা জানান, শ্রমিকদের মজুরি পুনর্বিবেচনার লক্ষ্যে গঠিত নতুন মজুরি বোর্ড ইতিমধ্যে প্রথম সভা করেছে। সভায় পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা এবং মজুরি পুনর্বিবেচনার কাজ শেষ করার জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের মাত্র তিন দিনের মধ্যে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের শ্রম ইতিহাসে এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা। প্রথম সভার মাত্র চার দিন পর আগামী ৯ নভেম্বর বোর্ডের দ্বিতীয় সভার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

তাঁর মতে, এত অল্প সময়ের মধ্যে বোর্ডের কার্যক্রম শুরু হওয়া শ্রমিকদের দাবি নিষ্পত্তিতে সরকারের আন্তরিকতা এবং দ্রুত পদক্ষেপের প্রতিফলন। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার মজুরি পুনর্বিবেচনার প্রক্রিয়া দ্রুত এগোচ্ছে।

তিনি আরও জানান, বোর্ডের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নে মালিকপক্ষ সহযোগিতা করবে।

আন্দোলন প্রত্যাহার করে কাজে ফেরার আহ্বান

শিল্পাঞ্চলে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ ও বিক্ষোভের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা। তাঁদের মতে, মজুরি পুনর্বিবেচনার জন্য যখন প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তখন আন্দোলন-বিক্ষোভ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে শ্রমিক, পোশাকশিল্প এবং সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতির ওপর। তাই শ্রমিকদের আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মালিকপক্ষের নেতারা শ্রমিকদের ধৈর্য ধরার, মজুরি বোর্ডের কার্যক্রমের ওপর আস্থা রাখার এবং অবিলম্বে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানান।

তাঁরা বলেন, শিল্পকারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলে মজুরি বোর্ড নির্বিঘ্নে কাজ শেষ করতে পারবে। এতে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণের পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমও সচল থাকবে।

অস্থিরতা সৃষ্টিতে স্বার্থান্বেষী মহলের শঙ্কা

সংবাদ সম্মেলনে পোশাকশিল্পের নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, কোনো কোনো স্বার্থান্বেষী মহল শ্রমিক অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

তাঁদের মতে, শ্রমিকদের মজুরি-সংক্রান্ত দাবি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য সরকার, মালিকপক্ষ ও দায়িত্বশীল শ্রমিক সংগঠনগুলো কাজ করছে। এ অবস্থায় কোনো ধরনের উসকানি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে চলমান উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তাই শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখা এবং দায়িত্বশীল আচরণের ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা।

শ্রমিকদের জন্য বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও ফ্যামিলি কার্ডের প্রস্তাব

শুধু মজুরি বৃদ্ধি নয়, পোশাক শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নেও সরকারের কাছে একাধিক প্রস্তাব দিয়েছে বিকেএমইএ। সংগঠনটির নেতারা মনে করেন, শ্রমিকদের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি আবাসন, খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—

১. বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ: শিল্পাঞ্চলে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা, যাতে মজুরি বৃদ্ধির সুযোগে বাড়ির মালিকরা ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়াতে না পারেন।

২. রেশনিং ও ফ্যামিলি কার্ড: পোশাক শ্রমিকদের জন্য রেশনিং সুবিধা অথবা ফ্যামিলি কার্ড চালু করা, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়।

৩. বিশেষায়িত হাসপাতাল: শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের জন্য সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন করা।

৪. শ্রমিকদের আবাসন: দেশের প্রধান পোশাকশিল্পকেন্দ্রগুলোতে শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট আবাসনব্যবস্থা বা ডরমিটরি নির্মাণ করা।

বিকেএমইএর মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শ্রমিকদের দৈনন্দিন ব্যয় কমবে এবং তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

উৎপাদন ও রপ্তানি সচল রাখার ওপর গুরুত্ব

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্প অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত। এ খাতের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে লাখ লাখ শ্রমিকের জীবিকা এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বিষয়টি জড়িত। ফলে শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু কারখানার মালিক বা শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

পোশাকশিল্পের নেতারা বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা এবং মজুরি-সংক্রান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সরকার, মালিকপক্ষ ও দায়িত্বশীল শ্রমিক সংগঠনগুলো সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। এ প্রক্রিয়াকে সফল করতে সব পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।

তাঁদের প্রত্যাশা, শ্রমিকরা কাজে ফিরে গেলে এবং শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম শেষ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণ, কারখানার উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের স্বার্থ রক্ষা করা সহজ হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!