ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬

menu

নির্বাচনে ভরাডুবির জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করলেন ট্রাম্প, আবার হামলার হুঁশিয়ারি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২৬, ১০:২২ এএম

নির্বাচনে ভরাডুবির জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করলেন ট্রাম্প, আবার হামলার হুঁশিয়ারি

ছবিঃ সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের ভূমিকা ছিল বলে স্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং জনমনে অসন্তোষ তৈরি হওয়ায় নির্বাচনে দলটি রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে স্বীকার করলেও ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্তকে ভুল মনে করছেন না তিনি। বরং একই পরিস্থিতি তৈরি হলে আবারও ইরানে হামলার নির্দেশ দিতেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাঁর যুক্তি, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া যাবে না।

স্থানীয় সময় বুধবার (৪ নভেম্বর) হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন ট্রাম্প। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ইরান যুদ্ধসংক্রান্ত মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই বক্তব্যের সঙ্গে তিনি অনেকাংশে একমত। কারণ, যুদ্ধের প্রভাবে স্বল্প মেয়াদে জ্বালানির দাম বেড়েছে, যা ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। তবে রাজনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকলেও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া তাঁর সামনে অন্য কোনো বিকল্প ছিল না বলে দাবি করেন তিনি। খবর বিবিসির।

ট্রাম্প বলেন, ‘আবার যদি একই পরিস্থিতি তৈরি হতো, তাহলে আমাকে আবারও একই কাজ করতে হতো। কারণ, দীর্ঘ মেয়াদে এটিই একমাত্র সমাধান। ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যায় না।’

নির্বাচনে পরাজয়ের পরও যুদ্ধের সিদ্ধান্তে অনড় ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের পর ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সামরিক সংঘাতের কারণে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে তৈরি হওয়া অসন্তোষ নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প জানান, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও অনেক বেশি বেড়ে যেতে পারে বলে তাঁর ধারণা ছিল। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে এখন বিপুল পরিমাণ তেল পরিবাহিত হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

ট্রাম্পের ভাষ্য, যুদ্ধের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য ছিল। তবে নির্বাচনে ভোটারদের অসন্তোষের পেছনে শুধু যুদ্ধ নয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তিনি বলেন, ‘ইরানের বিষয়টি আমাদের করতেই হতো। আমরা এখনো সেটি করছি।’

নিজে প্রার্থী হলে জিততেন, দাবি ট্রাম্পের

নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয় নিয়ে নিজের জনপ্রিয়তার প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, তিনি নিজে নির্বাচনে প্রার্থী হলে রিপাবলিকানরা জয়লাভ করত।

নিজের নির্বাচনি সমাবেশে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও সমর্থন ছিল অবিশ্বাস্য। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তা অন্য রিপাবলিকান প্রার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি।

এদিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা তাঁর প্রশাসনের নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

এ সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে দায়িত্ব থেকে সরানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানান ট্রাম্প। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কাজের প্রশংসা করে তিনি বলেন, হেগসেথ খুব ভালো কাজ করছেন।

ইরান যুদ্ধকেই পরাজয়ের কারণ বলছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স

ট্রাম্পের বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে রিপাবলিকানদের নির্বাচনি বিপর্যয়ের জন্য সরাসরি ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেন।

ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা হেরেছি যুদ্ধের কারণে। প্রেসিডেন্ট নিজেই গত রাতে তা বলেছেন।’

তাঁর মতে, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প ও ভ্যান্সকে ভোট দেওয়া অনেক মার্কিন নাগরিক এবার ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করেছেন। অর্থাৎ, রিপাবলিকানদের ভোটাররা শুধু নির্বাচনে অংশ নিতে ব্যর্থ হননি; বরং তাঁদের একটি অংশ দল পরিবর্তন করে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন।

ভ্যান্স আরও বলেন, আগামী ছয় বছরের জন্য সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো যদি ইরান যুদ্ধের মূল্য হিসেবে মেনে নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তাহলে সেটির পক্ষে রাজনৈতিক যুক্তি তুলে ধরা উচিত। তবে নির্বাচনে পরাজয়ের প্রকৃত কারণ নিয়ে সৎ আলোচনা করতে হলে ইরান যুদ্ধের প্রভাব স্বীকার করতে হবে।

ভাইস প্রেসিডেন্টের এমন বক্তব্য রিপাবলিকান শিবিরের ভেতরে যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে মতপার্থক্যের বিষয়টি সামনে এনেছে। বিশেষ করে যুদ্ধের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক ও নির্বাচনি প্রভাব নিয়েও দলটির নেতাদের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়

গত ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের পাশাপাশি সিনেটের নিয়ন্ত্রণও রিপাবলিকানদের কাছ থেকে নিজেদের দখলে নিয়েছে দলটি।

এর ফলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের বাকি দুই বছরের শাসনামলে কংগ্রেসে তাঁর প্রশাসনের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও আইন প্রণয়নের উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বাজেট অনুমোদন, সরকারি ব্যয়, প্রশাসনিক সংস্কার এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে রিপাবলিকান প্রশাসনকে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল তাই শুধু দলীয় পরাজয় নয়, ট্রাম্প প্রশাসনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জ্বালানির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় ভোটারদের অসন্তোষের কারণ

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে সামরিক হামলা শুরুর পর থেকেই সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক চলছে। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে জ্বালানি পরিবহন ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। যুক্তরাষ্ট্রেও পেট্রলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি সামরিক সংঘাতে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির ঘটনাও জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।

এবিসি নিউজের নির্বাচনি জরিপ অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে ভোট দেওয়া মার্কিন নাগরিকদের ৩৪ শতাংশের কাছে ইরান যুদ্ধ ছিল ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয়কে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন ৪৯ শতাংশ এবং সরকারি দুর্নীতিকে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন ৫৫ শতাংশ ভোটার।

জরিপের এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ইরান যুদ্ধ নির্বাচনে প্রভাব ফেললেও ভোটারদের অসন্তোষের একমাত্র কারণ ছিল না। দ্রব্যমূল্য, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারের প্রতি আস্থার বিষয়গুলোও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

রিপাবলিকান শিবিরে যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন

নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের কারণে রাজনৈতিক ক্ষতির কথা স্বীকার করলেও সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছেন। অন্যদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বক্তব্যে যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে রিপাবলিকান নেতৃত্বের ভেতরেই প্রশ্ন ওঠার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

একদিকে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাকে সামরিক অভিযানের প্রধান যুক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ভোটারদের অসন্তোষের কারণে দলটির নির্বাচনি ভিত্তি দুর্বল হয়েছে বলে মনে করছেন ভ্যান্স।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে মার্কিন রাজনীতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!