রাজধানীর উত্তরায় ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার সময় ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) এক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে মারধর করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনতা। অতীশ দর্শী চাকমা নামের ওই ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার নামে হকার ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এক দোকানদারের কাছ থেকে জরিমানা কমিয়ে দেওয়ার আশ্বাসে তাঁর এক সহযোগী ১ হাজার ৫০০ টাকা নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। পরে উত্তেজিত জনতা তাঁকে ঘিরে ধরে মারধর করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়।
গত বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের মোড়, জসিমউদ্দিন সড়কের পাকার মাথা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানে ঘুষের অভিযোগ
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার দুপুরে ডিএনসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অতীশ দর্শী চাকমা সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ওই এলাকায় ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে স্থানীয় হকার ও ব্যবসায়ীদের দোকানপাট সরিয়ে দেওয়ার কার্যক্রম চলছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযানের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে হকার ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হচ্ছিল। অভিযানের ভয় দেখিয়ে কিংবা জরিমানা কমিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নেওয়া হতো বলে দাবি তাঁদের।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আরও অভিযোগ, নিয়ম অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি প্রয়োজন হলেও ওই দিনের অভিযানে ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে কোনো পুলিশ সদস্য ছিলেন না।
হকারের ২০ হাজার টাকার মালামাল নেওয়ার অভিযোগ
অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত এক হকার অভিযোগ করেন, উচ্ছেদ কার্যক্রমের নামে তাঁর দোকানের নগদ টাকা ও সিগারেটসহ প্রায় ২০ হাজার টাকার মালামাল নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘অভিযানের নামে ওরা আমাকে পথে বসিয়ে দিয়েছে। এর আগে আমার দোকানের ক্যাশ টাকা ও সিগারেটসহ প্রায় ২০ হাজার টাকার মালামাল নিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর আগে সিটি করপোরেশনে ৫ হাজার টাকা দিতে বাধ্য করা হলেও কোনো ধরনের রশিদ বা স্লিপ দেওয়া হয়নি।’
তাঁর অভিযোগ, অর্থ পরিশোধের পরও কোনো ধরনের লিখিত প্রমাণ দেওয়া হয়নি। ফলে আদায় করা অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
১ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ, উত্তেজিত জনতার মারধর
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, বুধবারের অভিযানের সময় এক দোকানদারের কাছ থেকে কম জরিমানা করিয়ে দেওয়ার আশ্বাসে ম্যাজিস্ট্রেটের এক সহযোগী নগদ ১ হাজার ৫০০ টাকা গ্রহণ করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে উপস্থিত ব্যবসায়ী ও স্থানীয় লোকজন প্রতিবাদ জানান। একপর্যায়ে তাঁরা তল্লাশি চালিয়ে ওই টাকা উদ্ধার করেছেন বলে দাবি করেন।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনতা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ঘিরে ধরেন। একপর্যায়ে তাঁকে মারধর করা হয়। পরে উত্তেজিত পরিস্থিতির মধ্যে তিনি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
খবর পেয়ে উত্তরা পশ্চিম থানা ও বিমানবন্দর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে অবরুদ্ধ ম্যাজিস্ট্রেটকে উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নেওয়া হয়।
ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার ম্যাজিস্ট্রেটের
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডিএনসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অতীশ দর্শী চাকমা।
গণমাধ্যমের কাছে নিজের বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমি এক দোকানদারকে নিয়ম অনুযায়ী ১০ হাজার টাকার জরিমানার রায় দিয়েছি। রায় ঘোষণার পর ওই দোকানদার আমাকে জানান যে, এই মুহূর্তে তাঁর কাছে নগদ টাকা নেই এবং তিনি একটু সময় প্রার্থনা করেন। আমি মানবিক দিক বিবেচনা করে তাঁকে টাকা পরিশোধের জন্য সময় দিয়েছিলাম। এর বাইরে ঘুষ নেওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি।’
অর্থাৎ, তাঁর দাবি অনুযায়ী, দোকানদারের কাছ থেকে জরিমানা আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তাৎক্ষণিক অর্থ পরিশোধে অপারগতা প্রকাশ করায় তাঁকে সময় দেওয়া হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের উত্থাপিত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এবং উদ্ধার করা টাকার বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে অভিযোগকারীদের দাবির স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে।
তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন
নগরীর ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং জনসাধারণের চলাচল নির্বিঘ্ন করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। এসব কার্যক্রম পরিচালনায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু উচ্ছেদ অভিযানের সময় অর্থ আদায়, জরিমানা কমিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে টাকা গ্রহণ এবং রসিদ ছাড়া অর্থ নেওয়ার মতো অভিযোগ উঠলে প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
অন্যদিকে, একজন সরকারি কর্মকর্তাকে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মারধরের ঘটনাও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
উত্তরার এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—উচ্ছেদ অভিযানে আদায় করা অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছিল কি না, অভিযোগ অনুযায়ী ১ হাজার ৫০০ টাকা কে গ্রহণ করেছিলেন, হকারের কাছ থেকে নেওয়া ৫ হাজার টাকা ও মালামালের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং অভিযুক্ত ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে ডিএনসিসি কোনো বিভাগীয় তদন্ত করবে কি না।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। ডিএনসিসি ও স্থানীয় প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।

