দেশে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে মোট ৫৮ দশমিক ০৫ লাখ টন সার মজুত রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি, দেশে বর্তমানে সারের কোনো সংকট নেই। আগামী মৌসুমেও সার সরবরাহে ঘাটতি হবে না। অথচ পর্যাপ্ত মজুত ও সরকারি বরাদ্দ থাকার পরও মাঠপর্যায়ে চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না কৃষকেরা। কোথাও বেশি দামে সার বিক্রি, কোথাও বরাদ্দের সার অন্য জেলায় পাচার, আবার কোথাও ডিলারদের অনিয়ম ও কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি, ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা, কালোবাজারি ও সার পাচার বন্ধ এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনের নেতৃত্বে মনিটরিং জোরদারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থায়ী বাসিন্দাদের ডিলার নিয়োগের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
কমিটির সভাপতি ও লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, কমিটির সদস্য এবং কৃষি মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সার ও বীজ ব্যবস্থাপনা, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, কৃষিজমি সংরক্ষণ, কীটনাশকের ব্যবহার, দেশীয় তুলা উৎপাদন, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও রপ্তানিসহ কৃষি খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
মজুত পর্যাপ্ত, তবু কৃষকের হাতে সার পৌঁছাচ্ছে না
বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশে বর্তমানে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। গত পাঁচ বছরের তুলনায় চলতি বছর অধিক পরিমাণ সার সরবরাহ করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলাসহ দেশের কোথাও সারের প্রকৃত সংকট নেই বলে দাবি করেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান।
তবে মাঠপর্যায়ে সার না পাওয়ার অভিযোগের পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে রয়েছে নতুন সার বিতরণ নীতিমালার পরিবর্তন, ডিলারদের ব্যবসায়িক বিরোধ, কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা, খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি, কালোবাজারে সার পাচারের চেষ্টা এবং রবি মৌসুমের জন্য আগাম সার মজুতকে কেন্দ্র করে কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি।
সচিব জানান, সার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম প্রতিরোধে ইতোমধ্যে মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মনিটরিং সেল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেশের ৬৪ জেলায় ৬৪ জন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে জরিমানা করা হচ্ছে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে পাঁচজন কৃষি কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার এবং অনিয়মের কারণে পাঁচজন ডিলারের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, সার ডিলার হতে হলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা ও স্থানীয় ভোটার হতে হবে। এ শর্ত পূরণ না করা বহিরাগত ডিলারদের পর্যায়ক্রমে ডিলারশিপ বাতিল করে নতুন ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত দামে সার কেনার অভিযোগ
বৈঠকে সংসদ সদস্যরা মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, সরকারি হিসাবে সার পর্যাপ্ত থাকলেও কৃষকেরা চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না। আমন মৌসুমে বিভিন্ন এলাকায় সারের সংকট এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কমিটির সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চলতি আমন মৌসুমে মাঠপর্যায়ে কৃষকের চাহিদামতো সার না পাওয়ার বিষয়টি দেখা গেছে। পর্যাপ্ত মজুত ও বরাদ্দ থাকার পরও কৃষকেরা কেন সার পাচ্ছেন না, তা সরেজমিনে যাচাই করা প্রয়োজন।
তিনি অভিযোগ করেন, কোনো কোনো এলাকায় প্রতি বস্তা সার ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত দামে কিনতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে কৃষকদের রক্ষা করতে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সার ব্যবস্থাপনার ওপর নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে কালোবাজারি, এক জেলা থেকে অন্য জেলায় সার পাচার এবং বরাদ্দের অনিয়ম বন্ধের দাবি জানান। সার বিক্রির সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ও তদারকি নিশ্চিত করার পাশাপাশি মনিটরিং সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নাম, পদবি ও মোবাইল নম্বর সংসদ সদস্যদের সরবরাহের প্রস্তাব দেন তিনি।
বরাদ্দের সার অন্য জেলায় পাচারের অভিযোগ
বৈঠকে সদস্য গোলাম রছুল তাঁর নির্বাচনি এলাকার সার বিতরণ ব্যবস্থাপনার অনিয়ম তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাঁর এলাকার বাগারপাড়া উপজেলায় সারের পর্যাপ্ততা থাকলেও বিক্রয় ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা রয়েছে।
বরাদ্দ করা সার অন্য জেলায় বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে পাচারের অভিযোগে স্থানীয়দের সহযোগিতায় দুই থেকে তিনটি সারবোঝাই ট্রাক আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
গোলাম রছুল আরও বলেন, বাগারপাড়ার ৩৭ জন ডিলারের মধ্যে প্রায় ২০ জন স্থানীয় বাসিন্দা নন। তাঁদের কেউ কেউ নিজেরা সরাসরি ব্যবসা পরিচালনা না করে অন্যদের মাধ্যমে ডিলারশিপ পরিচালনা করছেন। আবার কেউ কেউ সাব-ডিলার নিয়োগ দিয়ে ব্যবসা করছেন।
এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থায়ী বাসিন্দাদের ডিলার নিয়োগ এবং সার বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে, সদস্য মো. রোকন উদ্দীন বাবুল বলেন, নীলফামারী এলাকায় আগের তুলনায় কোনো কোনো মাসে ডিলারদের কম পরিমাণ সার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও মাঠপর্যায়ে সংকট তৈরি হওয়া বিতরণ ও মনিটরিং ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
তিনি নিয়মিত মাঠপর্যায়ে তদারকি এবং প্রকৃত ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় নাগরিকদের অগ্রাধিকার দিয়ে ডিলার নিয়োগের সুপারিশ করেন।
কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ছে, আসছে কৃষক কার্ড
বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. নুরুজ্জামান মন্ত্রণালয়ের চলমান কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
তিনি জানান, টেকসই, নিরাপদ ও লাভজনক কৃষি প্রতিষ্ঠা মন্ত্রণালয়ের মূল লক্ষ্য। কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শস্য বহুমুখীকরণ, নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদন, কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ এবং খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী কৃষক কার্ড চালু, খাল খনন, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) কার্যক্রম পুনঃসচল, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, কৃষিজমি সুরক্ষা, কৃষি উদ্যোক্তা সৃষ্টি, সমবায় পুনরুজ্জীবন ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল ২৪ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সম্ভাব্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। প্রকল্প ক্লাস্টারিং ও রিস্কোপিংয়ের মাধ্যমে ৬১৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
গদখালীতে ফুল গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের দাবি
বৈঠকে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালীতে ফুল গবেষণা কেন্দ্র ও মৃত্তিকা পরীক্ষাগার স্থাপনের দাবি জানান সংসদ সদস্য সাবিরা সুলতানা।
তিনি বলেন, গদখালী দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফুল উৎপাদন এলাকা হলেও সেখানে ফুল ও মৃত্তিকা গবেষণার পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। ফলে কৃষকদের মাটি পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শের জন্য যশোর শহরে যেতে হয়। এতে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও দরিদ্র কৃষকদের বাড়তি অর্থ ও সময় ব্যয় করতে হয়।
তিনি গদখালীতে গবেষণা ও পরীক্ষাগার সুবিধা স্থাপনের পাশাপাশি ফুলচাষিদের জন্য সহজে মাটি পরীক্ষার ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
সাবিরা সুলতানা আরও বলেন, যশোরে তুলা চাষের সম্ভাবনা বিবেচনায় সরকার ২০ হাজার ৫০০ জনকে ২০ কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এ উদ্যোগ থেকে সরকার ১২৬ কোটি টাকা লাভবান হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফুল ও তুলা পর্যায়ক্রমে চাষের মাধ্যমে কৃষকদের আয় বাড়ানোর সম্ভাবনাও তুলে ধরেন তিনি।
এ ছাড়া কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি কেটে নেওয়ার কারণে উর্বরতা হ্রাস, কীটনাশক ও খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
এ বিষয়ে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আফসার আলী জানান, যশোরে তাঁদের আঞ্চলিক গবেষণাগার ও কার্যালয়ের মাধ্যমে মোবাইল সয়েল টেস্টিং ল্যাব ব্যবহার করে কৃষকদের মাটি পরীক্ষা এবং ফসলভিত্তিক সার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি সচিব জানান, গদখালীতে ফুল গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব নথিভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ফুলচাষিদের দ্রুত মাটি পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে অস্থায়ী মৃত্তিকা পরীক্ষা ক্যাম্প বা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ক্ষতিকর কীটনাশক নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা
কৃষিপণ্যে কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন সংসদ সদস্যরা।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুস সালাম জানান, কীটনাশক খাতের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও নির্দেশিকা প্রণয়নের জন্য একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ইতোমধ্যে পাঁচটি সভা করেছে। শিগগিরই খসড়া প্রতিবেদন দাখিলের সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, কীটনাশক ব্যবস্থাপনায় যুগোপযোগী নীতিমালা ও মানসম্মত স্পেসিফিকেশন প্রণয়ন করা হবে। আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর কীটনাশকের আমদানি এবং বিক্রি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাশাপাশি কৃষকদের নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহারে প্রশিক্ষণ এবং সবজি উৎপাদনে কীটনাশকের ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশ নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পেঁয়াজ, আদা, মরিচ ও টমেটো উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্য
আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে কৃষিপণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং পর্যায়ক্রমে রপ্তানিমুখী কৃষি গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, পেঁয়াজ, আদা, কাঁচা মরিচ ও টমেটোর উৎপাদন বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য ২৭ হাজার ৭০০টি এয়ার ফ্লো মেশিন সরবরাহের মাধ্যমে প্রায় তিন লাখ টন সংরক্ষণ সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি পেঁয়াজ রপ্তানির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
আদার উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে আগামী দুই বছরের মধ্যে চাহিদা ও উৎপাদনের ঘাটতি পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, কাঁচা মরিচ ও টমেটোর বর্ষাকালীন উৎপাদন বাড়িয়ে এক থেকে দুই বছরের মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী আরও জানান, মাটির স্বাস্থ্য ও উর্বরতা উন্নয়নে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। মাটির পিএইচের ভারসাম্য উন্নত করে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ও আমদানি কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। চরাঞ্চলে সয়াবিন, বাদাম, ভুট্টা, মিষ্টি আলু ও মিষ্টি কুমড়াসহ উপযোগী ফসল উৎপাদনেও বিশেষ প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।
বছরে ৪৫ হাজার কোটি টাকার তুলা আমদানি
দেশীয় তুলা উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টিও বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পায়। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল আমিন জানান, প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার তুলা আমদানি করা হয়। এ আমদানিনির্ভরতা কমাতে পাহাড়ি, পরিত্যক্ত ও অনাবাদি জমিতে তুলা চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া তামাক চাষের পরিবর্তে তুলা চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। মরিচ, হলুদ ও বিভিন্ন শাকসবজির সঙ্গে তুলার আন্তঃফসল চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
রাজশাহী ও নাটোরের কয়েকটি এলাকায় হলুদের সঙ্গে তুলা চাষে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, তুলা চাষ মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। ভবিষ্যতে কার্বন ট্রেডিংয়ের মাধ্যমেও কৃষকেরা আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার ৪ হাজার ১০০ পদ শূন্য
কৃষকদের মাঠপর্যায়ে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে জনবল সংকটের বিষয়টিও বৈঠকে উঠে আসে।
কৃষি সচিব জানান, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার অনুমোদিত ১৪ হাজার ৯২টি পদের মধ্যে বর্তমানে ৪ হাজার ১০০টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৬০টি পদে নিয়োগ কার্যক্রম চলমান। অবশিষ্ট শূন্যপদ পূরণের জন্য সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) চাহিদা পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংসদ সদস্যরা বলেন, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ, সার বিতরণ তদারকি ও কৃষি উৎপাদন বাড়াতে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইউনিয়ন পর্যায়ে জনবল সংকট দ্রুত দূর করা প্রয়োজন।
বৈঠকে বিএডিসির গোডাউনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন এবং বিএডিসি ও বিএমডিএর বৈদ্যুতিক গভীর নলকূপ সৌরশক্তিতে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। এ বিষয়ে দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সমীক্ষা সম্পন্ন করে কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি খাতের উন্নয়নে ১০ দফা সুপারিশ
বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা শেষে কৃষি খাতের ব্যবস্থাপনা ও কার্যক্রম গতিশীল করতে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ গ্রহণ করে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. সার ডিলার নিয়োগে সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার শর্ত কঠোরভাবে অনুসরণ এবং নীতিমালাবহির্ভূত ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।
২. সারের কৃত্রিম সংকট, অবৈধ মজুত ও অনিয়ম প্রতিরোধে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) নেতৃত্বে মনিটরিং জোরদার।
৩. আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশকের আমদানি ও ব্যবহার বন্ধে যুগোপযোগী নীতিমালা এবং মানদণ্ড প্রণয়ন।
৪. রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব ও প্রাকৃতিক সার উৎপাদন এবং ব্যবহারে উৎসাহিত করা।
৫. বিএডিসির গোডাউনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ গ্রহণ।
৬. বিএডিসি ও বিএমডিএর গভীর নলকূপগুলো পর্যায়ক্রমে সৌরশক্তিতে রূপান্তর।
৭. তুলা আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমাতে দেশীয় তুলা উৎপাদন বৃদ্ধি।
৮. যশোরের গদখালীতে মৃত্তিকা পরীক্ষা ক্যাম্প ও ফুল গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ।
৯. মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সেবা নিশ্চিত করতে শূন্য উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগ।
১০. কৃষি খাতের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার কার্যক্রম পর্যালোচনা, সার বিতরণে স্বচ্ছতা এবং কৃষিপণ্যের উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।
প্রতিটি দপ্তরের কার্যক্রম পৃথকভাবে পর্যালোচনা করবে কমিটি
কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় সার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্য দ্রুততার সঙ্গে কমিটির প্রথম পরিচিতি ও পর্যালোচনা সভা আহ্বান করা হয়েছে। ভবিষ্যতে মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি দপ্তর ও সংস্থার কার্যক্রম পৃথকভাবে পর্যালোচনা করা হবে।
তিনি জানান, বৈঠকে যশোরের ফুল ও সবজি চাষ, মিঠাপানির মাছ চাষের সম্ভাবনা, কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং দেশে তুলা উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
বিশেষ করে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ তুলা আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশীয় তুলা উৎপাদন বাড়াতে কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার পরও কৃষকেরা কেন চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না, তা নিয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির আলোচনায় সার বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা, ডিলারদের অনিয়ম, কালোবাজারি ও পাচারের বিষয়গুলো সামনে এসেছে। এখন এসব সুপারিশ কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে মাঠপর্যায়ে সারের সুষ্ঠু সরবরাহ এবং কৃষকদের ভোগান্তি কমানোর কার্যকারিতা।

