জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা তুহিন বর্তমানে রংপুর ভ্যাট কমিশনারেটে কর্মরত। ২০১৪ সালে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগে যোগদান করা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্বল্প সময়ের চাকরিজীবনে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সূত্র ও অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের নানা অভিযোগ উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৪ সালে চাকরিতে যোগদানের পর তার প্রথম কর্মস্থল ছিল যশোর ভ্যাট কমিশনারেট। সেখানে তিনি ২০১৬ সাল পর্যন্ত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয় একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, যশোরে কর্মরত অবস্থাতেই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রথম অভিযোগগুলো সামনে আসে।
২০১৬ সালে তার বদলি হয় তৎকালীন অবিভক্ত ঢাকা বন্ড কমিশনারেটে, যা বর্তমানে দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট নামে পরিচিত। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ওই পদায়নের জন্য তিনি প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয় করেছিলেন। এরপর থেকেই তার বিরুদ্ধে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগ বাড়তে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, বন্ড কমিশনারেটে কর্মরত অবস্থায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করতেন তিনি।
এক পর্যায়ে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন কমিশনার তাকে ছয় মাসের জন্য সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সে সময় তিনি কমিশনারকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন এবং বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান পর্যন্ত গড়ায়। পরবর্তীতে চাকরিতে ফিরে এসেও তিনি আগের মতোই প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন ফাইলকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও দুর্নীতি অব্যাহত রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, বন্ড কমিশনারেটে কর্মরত থাকাকালীন ২০১৭ সালে তিনি রাজধানীর রামপুরায় প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় করেন। একই সময়ে নিজ গ্রামের বাড়িতে তার মেজো ভাইয়ের নামে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে জমিসহ একটি বাড়ি কেনা হয়। এছাড়া গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার বারহাট্টায় একটি পার্ক নির্মাণ এবং একসঙ্গে প্রায় ২০ বিঘা জমি কেনার তথ্যও পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বন্ড কমিশনারেটে কর্মরত থাকাকালীন সময়েই তিনি প্রায় ৫০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হন।
পরবর্তীতে তার বদলি হয় সিলেটে। সেখানে তামাবিল শুল্ক স্টেশনে কর্মরত অবস্থায়ও তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, সীমান্ত দিয়ে আসা ট্রাকপ্রতি ৫০ হাজার টাকা করে ঘুষ আদায় করা হতো এবং প্রতিদিন তার অবৈধ আয় প্রায় ১০ লাখ টাকায় পৌঁছাত।
এ সময় তার বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, তামাবিলে কর্মরত অবস্থায় মদ বহনের অভিযোগে তিনি বিজিবির হাতে আটক হন। এ ঘটনায় বিজিবি সংবাদ সম্মেলনও করে এবং সে সময় বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে তার ছবিসহ সংবাদ প্রকাশিত হয়। যদিও পরবর্তীতে তিনি প্রশাসনিকভাবে দায়মুক্তি পান বলে অভিযোগ রয়েছে।
সিলেটে কর্মরত অবস্থায় ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ গ্রামের একটি মুদি দোকানের ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাবে জমা রাখার অভিযোগও পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, ওই হিসাবে এক পর্যায়ে প্রায় ৪০ লাখ টাকা জমা হয়। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অর্থ দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সিলেটের পর তার পদায়ন হয় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে। সেখানে কর্মরত একাধিক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও ব্যবসায়ীর দাবি, তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনা করতেন, যা বন্দরে কোন পণ্য কখন খালাস হবে, সে বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করত। অভিযোগ রয়েছে, কমিশনারের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন চালান আটকে রেখে মোটা অঙ্কের ঘুষ আদায় করা হতো। পাশাপাশি সদর দপ্তরে প্রভাব খাটিয়ে নিজের পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রেও তিনি ভূমিকা রাখতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, মাত্র দুই বছর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কর্মরত থেকেই তিনি অন্তত ৪০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হন। একই সময়ে রাজধানীর গুলশানে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটও কিনেছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে তার পারিবারিক তথ্যও উঠে এসেছে। তার বাড়ি নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার বড়ঘর গ্রামে। তার বাবা প্রয়াত চন্দন চৌধুরী ছিলেন একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং মা নিলিমা দেবনাথ ছিলেন একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বড় ভাই তুষার চৌধুরী ও বড় বোন বাণী চৌধুরীও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। মেজো ভাই সরকারি কলেজের শিক্ষক।
শিক্ষক পরিবারে বেড়ে ওঠা হলেও অভিযোগ রয়েছে, পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তুলেছেন তুহিন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের নামে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে ডিপিএস, এফডিআর এবং অন্যান্য সঞ্চয় হিসাবেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ সম্পদের উৎস নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যেও নানা প্রশ্ন রয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, ২০১২ সালে প্রথম বিয়ে করলেও পরবর্তীতে এসআই পদে চাকরির আবেদন করার সময় সেই বিয়ের তথ্য গোপন করেন। পরে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থায় এক বিবাহিত নারীকে বিয়ে করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে রাজধানীর গুলশানে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে তুহিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার বা নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে বলেন, "কাস্টমস ও ভ্যাটে কম-বেশি সবারই অবৈধ সম্পদ আছে। কারও কম, কারও বেশি।" তার সম্পদের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আপনাকে কি উত্তর দিতে হবে? দুদক আছে, আরও সংস্থা আছে, তারা দেখবে। আপনি দেখার কে?" এরপর তিনি উত্তেজিত হয়ে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
উল্লেখ্য, উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বাধীন তদন্ত এবং দুদকের আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন হওয়া প্রয়োজন।

