ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

মোংলা বন্দরে তিন প্রকৌশলীর ঘুষ-দুর্নীতির সিন্ডিকেট

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬, ১০:৫৩ এএম

মোংলা বন্দরে তিন প্রকৌশলীর ঘুষ-দুর্নীতির সিন্ডিকেট

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দর। বাগেরহাট জেলার পশুর নদীর পূর্ব তীরে এবং সুন্দরবনের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা এই বন্দর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও সম্প্রতি বন্দরটির কয়েকজন শীর্ষ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ব্যবসায়ীদের হয়রানি এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে পাঠানো একটি লিখিত অভিযোগে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী (সিভিল ও হাইড্রোলিক) শেখ শওকত আলী, উপ-প্রধান প্রকৌশলী (হাইড্রোলিক) বজলুর রহমান এবং নির্বাহী প্রকৌশলী (ড্রেজিং) মো. মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, প্রকল্পে অনিয়ম এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

ক্ষমতার ছত্রছায়ায় দুর্নীতির অভিযোগ

অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে মোংলা বন্দরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। ওই সময় নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম, জাল সনদ ও কোটা জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ, ড্রেজার ও পাইলট বোট ক্রয়, নেভিগেশন বয়া-বাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনাকাটা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অধিকাংশ অভিযুক্ত কর্মকর্তা ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময় প্রধান প্রকৌশলী শেখ শওকত আলী ছিলেন সবচেয়ে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের একজন এবং তার সঙ্গে উপ-প্রধান প্রকৌশলী বজলুর রহমান ও নির্বাহী প্রকৌশলী মতিউর রহমানও বিভিন্ন অনিয়মে সম্পৃক্ত ছিলেন।

ইনার বার ড্রেজিং প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২০ সালে প্রায় ৭৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে মোংলা বন্দরের ইনার বার ড্রেজিং প্রকল্প অনুমোদিত হলে শেখ শওকত আলীকে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) করা হয়। ২০২১ সালের ১৩ মার্চ প্রকল্পটির কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২২ সালের মধ্যেই প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রকল্প বিলম্বের কারণ হিসেবে প্রাকৃতিক ও কারিগরি জটিলতার কথা বললেও অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়ম ও আর্থিক অসঙ্গতি ছিল।

নিয়োগ বাণিজ্য থেকে নিম্নমানের পণ্য ক্রয়ের অভিযোগ

লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, শেখ শওকত আলীর বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, নিম্নমানের পণ্য ক্রয়, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।

একই সঙ্গে অভিযোগ করা হয়েছে, উপ-প্রধান প্রকৌশলী বজলুর রহমান ও নির্বাহী প্রকৌশলী মতিউর রহমান এসব কর্মকাণ্ডে তার সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া সেবা নিতে আসা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত অবৈধ অর্থ আদায় ও হয়রানির অভিযোগও রয়েছে।

সরকার পরিবর্তনের পরও বহাল

অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তা নিজেদের অবস্থান অক্ষুণ্ন রেখেছেন এবং এখনও গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল আছেন।

দুদকের অনুসন্ধান

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ২০২১ সালেই দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পড়েছিল। তবে সে সময় অভিযোগগুলোর কার্যকর তদন্ত এগোয়নি।

পরবর্তীতে ২০২৪ সালের আগস্টের পর অভিযোগগুলো পুনরায় পর্যালোচনা শুরু করে দুদক। বর্তমানে শেখ শওকত আলী, বজলুর রহমান ও মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

স্বজনদের নামে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তা নিজেদের নামে সম্পদ না রেখে স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

সূত্রের দাবি, খুলনা, বাগেরহাট, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাদের নামে বা বেনামে একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট, জমি, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল অঙ্কের অর্থ রয়েছে।

অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুদক ইতোমধ্যে শেখ শওকত আলী, তার স্ত্রী সালমা আক্তার ও দুই সন্তান শেখ শাফিন আহমেদ এবং শেখ নাহিন আহমেদের নামে সম্পদের তথ্য চেয়ে বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছে।

একইভাবে উপ-প্রধান প্রকৌশলী বজলুর রহমান, তার স্ত্রী আজিজা শবনম ও দুই সন্তানের সম্পদের তথ্য এবং নির্বাহী প্রকৌশলী মতিউর রহমান, তার স্ত্রী, শ্বশুর ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের তথ্যও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

টিআইবির পর্যবেক্ষণ

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক গবেষণায় মোংলা বন্দরে শুল্কায়ন, পণ্য খালাস ও পরিবহন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে ঘুষ ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেবা পেতে অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ম ও ঘুষের অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি রোধে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে।

অপসারণের দাবি কর্মকর্তাদের একাংশের

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মোংলা বন্দরের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, দেশের মোট সমুদ্রপথে বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ পরিচালনা করে মোংলা বন্দর। প্রতিবছর রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আয় ও পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বন্দরটি।

তাদের দাবি, "যদি দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে বন্দরের ভাবমূর্তি ও কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।"

যা বললেন অভিযুক্তরা

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মতিউর রহমান সব অভিযোগ অস্বীকার করে ফোন কেটে দেন।

উপ-প্রধান প্রকৌশলী বজলুর রহমান সাংবাদিক পরিচয় শুনে প্রথমে ফোন কেটে দেন। পরে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তায় তিনি বলেন,

"অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমাকে হেয় করার উদ্দেশ্যে এসব করা হয়েছে।"

অন্যদিকে প্রধান প্রকৌশলী শেখ শওকত আলীর সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল/অ.কা

দুর্নীতি থেকে আরও পড়ুন

banner
Link copied!