ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

এক বছরে ১৬০ প্রাণহানি, রাজশাহীর সড়কে নিরাপত্তা কোথায়?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৬, ১০:২৩ এএম

এক বছরে ১৬০ প্রাণহানি, রাজশাহীর সড়কে নিরাপত্তা কোথায়?

ছবিঃ সংগৃহীত

রাজশাহীর সড়ক-মহাসড়কে দিনের বেলাতেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ভারী ট্রাক ও বালুবাহী ডাম্প ট্রাক। অতিরিক্ত গতি, ধারণক্ষমতার বেশি মালামাল পরিবহন, অদক্ষ চালক এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের অভিযোগ রয়েছে এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে। এর পাশাপাশি মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহনের বেপরোয়া চলাচলও বাড়িয়ে দিচ্ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

পুলিশের তথ্য বলছে, গত এক বছরে রাজশাহী জেলা ও মহানগর এলাকায় ১৬৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৬০ জন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৬৯টি। দুর্ঘটনার প্রায় অর্ধেকেই মোটরসাইকেলের সম্পৃক্ততা রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৪০টি দুর্ঘটনায় ট্রাক বা ডাম্প ট্রাক জড়িত ছিল।

সড়ক বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, অতিরিক্ত গতি, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন, ট্রাফিক আইন না মানা এবং দুর্বল তদারকির কারণে রাজশাহীর সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এর সঙ্গে মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং অবৈধভাবে সড়কের জায়গা দখল করে হাটবাজার ও স্থাপনা গড়ে ওঠাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

ডাম্প ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ গেল দোকানির

চলতি বছরের ৫ মে রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের পুঠিয়া উপজেলার বিড়ালদহ এলাকায় ডাম্প ট্রাকের ধাক্কায় এক দোকানি নিহত হওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, ওই সড়কে দীর্ঘদিন ধরে বালুবাহী ডাম্প ট্রাকগুলো অতিরিক্ত গতিতে ও নিয়ম না মেনে চলাচল করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা দুটি ডাম্প ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং দীর্ঘ সময় রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।

এর আগে ১ জানুয়ারি একই মহাসড়কের ঝলমলিয়া বাজারে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বালুবাহী ট্রাক বাজারের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই চারজন নিহত হন এবং আরও কয়েকজন আহত হন।

এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর ২৬ জানুয়ারি বেলপুকুর এলাকায় বাস ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন। বছরের শুরুতেই পরপর এসব দুর্ঘটনা রাজশাহীর সড়ক ব্যবস্থাপনা, যান নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করে।

এক বছরে ১৬৯ দুর্ঘটনা, মৃত্যু ১৬০ জনের

রাজশাহী জেলা পুলিশ ও রাজশাহী মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত এক বছরে জেলায় ১৩৫টি এবং মহানগর এলাকায় ৩৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে।

অর্থাৎ জেলা ও মহানগর মিলিয়ে দুর্ঘটনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৯টি। এসব দুর্ঘটনায় মোট ১৬০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। একই সময়ে দুর্ঘটনা নিয়ে ১৬৯টি মামলা হয়েছে।

পুলিশের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনার বড় একটি অংশে মোটরসাইকেলের সম্পৃক্ততা রয়েছে। পাশাপাশি ট্রাক ও ডাম্প ট্রাকও দুর্ঘটনার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ যান হিসেবে উঠে এসেছে।

কেন বাড়ছে দুর্ঘটনা?

সড়ক সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজশাহীর সড়কে দুর্ঘটনার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বরং চালকের ভুল, যানবাহনের ত্রুটি, সড়কের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা—সব মিলিয়েই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে ভারী ট্রাক ও ডাম্প ট্রাকের ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বালু, মাটি বা অন্যান্য পণ্য বহন করা হয়। অতিরিক্ত ওজনের কারণে গাড়ির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ব্রেক নিয়ন্ত্রণেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া অনেক বালুবাহী ট্রাকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা কভার ব্যবহার না করায় চলন্ত অবস্থায় বালু ও ধুলাবালি সড়কে ছড়িয়ে পড়ে। এতে পেছনের বা পাশের যানবাহনের চালকদের দৃষ্টিসীমা কমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।

অদক্ষ চালক ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনও বড় ঝুঁকি

পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অনেক চালকের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে হেলপারকে দিয়ে গাড়ি চালানোর অভিযোগও রয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফিটনেসবিহীন যানবাহন। পুরোনো ও যান্ত্রিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি নিয়মিত চলাচল করলে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

অন্যদিকে দ্রুতগতির ভারী যানবাহনের সঙ্গে ইজিবাইক, অটোরিকশা, ভটভটি ও অন্যান্য ধীরগতির যান একই সড়কে চলাচল করায় যানবাহনের গতির পার্থ্যক্যও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

‘শুধু ডাম্প ট্রাককে দায়ী করলে হবে না’

পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতারা মনে করেন, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু ডাম্প ট্রাককে দায়ী করলে সমস্যার প্রকৃত কারণ আড়ালে থেকে যাবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং রাজশাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি আলামিন সরকার টিটু বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে।

তার ভাষ্য, মহাসড়কে ইজিবাইক, অটোরিকশা ও ভটভটির জন্য পৃথক লেন বা সড়ক না থাকায় এসব যান অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচল করছে। অনেক চালকের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা নেই।

তিনি আরও বলেন, মহাসড়কের পাশে সরকারি জায়গা দখল করে অবৈধ স্থাপনা ও হাটবাজার গড়ে ওঠায় সড়ক সংকুচিত হয়ে পড়ছে। অদক্ষ চালক, বেপরোয়া গতি এবং অতিরিক্ত মালামাল পরিবহনও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

তার মতে, মহাসড়কগুলো ধাপে ধাপে চার লেনে উন্নীত করা এবং ইজিবাইক-অটোরিকশার জন্য পৃথক লেন বা বিকল্প সড়ক তৈরি করা গেলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

‘সচেতনতার অভাবও বড় সমস্যা’

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) রাজশাহী জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আমানুল্লাহ বিন আখতার আবিদ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। যেখানে প্রশস্ত সড়ক প্রয়োজন, সেখানে এখনও পর্যাপ্ত অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।

তিনি বলেন, যেসব স্থানে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে, সেগুলোর অনেকগুলোই তুলনামূলক সরু সড়ক। পাশাপাশি চালকদের অসাবধানতা এবং বিদ্যমান আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ না হওয়াও দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

তার মতে, রাজশাহীর অনেক সড়ক অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য উপযোগী নয়। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় গতি নিয়ন্ত্রণ করে গাড়ি চালানো প্রয়োজন। সড়কের ধরন অনুযায়ী নিরাপদ গতিসীমা নির্ধারণ ও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

ট্রাফিক আইন মানাতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম

রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. নূর আলম সিদ্দিকী বলেন, নগরীতে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ সাধারণ মানুষের পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব। পাশাপাশি অনেক চালক বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই যানবাহন চালাচ্ছেন।

তিনি জানান, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। দুর্ঘটনা কমাতে পুলিশ নিয়মিত বিভিন্ন কর্মশালা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

মোটরসাইকেল, ট্রাক, ডাম্প ট্রাক ও অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের সম্পৃক্ততায় দুর্ঘটনা ঘটছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চালক ও পথচারী—উভয়ের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়নে পুলিশ কাজ করছে।

সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কমবে না প্রাণহানি

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে কিংবা দুর্ঘটনার পর মামলা করেই রাজশাহীর সড়ককে নিরাপদ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা।

এর মধ্যে ভারী যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ যাচাই, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন বন্ধ, বালুবাহী ট্রাকে বাধ্যতামূলক কভার ব্যবহার, মহাসড়ক থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং ধীরগতির যানবাহনের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে সড়কের নকশা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজশাহীতে জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা সড়কের বিস্তৃতি বাড়ার পাশাপাশি যানবাহনের সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত না হলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

তাই নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে প্রশাসন, পুলিশ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, চালক এবং সাধারণ মানুষ—সব পক্ষের সমন্বিত ও দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপরই এখন গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!