চোখের চিকিৎসা করাতে স্বামীর সঙ্গে বগুড়া থেকে ঢাকায় এসেছিলেন প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীন (৫৪)। স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের প্রত্যাশা ছিল—চিকিৎসা শেষে আবারও বগুড়ায় ফিরবেন তিনি, ফিরবেন কর্মস্থলে, দাঁড়াবেন প্রিয় শিক্ষার্থীদের সামনে। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না। রাজধানীর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হয়ে মারা গেছেন এই শিক্ষিকা।
শনিবার (২৯ আগস্ট) ভোরে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহত রনজিলা পারভীন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তার বাড়ি গাবতলী উপজেলার সোনাকানিয়া গ্রামে।
চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকার পথে
পরিবারের সদস্যরা জানান, চোখের চিকিৎসার জন্য শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাত ১২টার দিকে স্বামী আব্দুল মতিনকে সঙ্গে নিয়ে বাসে করে বগুড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন রনজিলা পারভীন। শনিবার ভোরে তারা ঢাকার গাবতলী এলাকায় পৌঁছান।
সেখান থেকে স্বামী-স্ত্রী রিকশায় করে ফার্মগেটের খামারবাড়ি এলাকার ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালের দিকে যাচ্ছিলেন। চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর আগেই সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা এলাকায় ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
ব্যাগ টানতেই রিকশা থেকে ছিটকে পড়েন
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সংসদ ভবন এলাকায় পৌঁছানোর পর দ্রুতগতির একটি মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি রনজিলা পারভীনের হাতে থাকা ভ্যানিটি ব্যাগ টান দিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় ভারসাম্য হারিয়ে তিনি রিকশা থেকে সড়কে ছিটকে পড়ে যান।
রাস্তায় পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। স্বামী আব্দুল মতিন দ্রুত তাকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকরা ধারণা করছেন, মাথায় গুরুতর আঘাত ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।
‘হাসপাতালে যাওয়ার আগেই সব শেষ’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহত শিক্ষিকার ছোট ভাই তাবেজ আহমেদ বলেন, চোখের চিকিৎসার জন্য তার বড় বোন ও ভগ্নিপতি শুক্রবার রাতে বগুড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। ভোরে গাবতলী পৌঁছে তারা রিকশায় করে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন।
তিনি বলেন, সংসদ ভবন এলাকায় মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি রনজিলার ব্যাগ টান দিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে তিনি রিকশা থেকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা বগুড়ার গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন বলে জানান তিনি।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের করুণ পরিণতি
রনজিলা পারভীনের দীর্ঘ কর্মজীবন ছিল শিক্ষকতায়। ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে তিনি সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার পর পদোন্নতি পেয়ে বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হন।
শিক্ষকতা জীবনে এলাকার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। তার আকস্মিক মৃত্যুতে সহকর্মী, শিক্ষার্থী, স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, স্বামী আব্দুল মতিন ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে তিনি বগুড়া শহরের রহমাননগর এলাকায় বসবাস করতেন। তার স্বামী ব্যবসা করেন এবং একমাত্র মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।
সিসিটিভিতে মোটরসাইকেল, অস্পষ্ট নম্বর প্লেট
ঘটনার পর ছিনতাইকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক পর্যালোচনায় একটি দ্রুতগতির সুজুকি জিক্সার এসএফ মোটরসাইকেলে দুই ব্যক্তিকে চলাচল করতে দেখা গেছে। মোটরসাইকেল চালকের মাথায় হেলমেট ও পরনে সাদা শার্ট ছিল। পেছনে থাকা ব্যক্তির মুখে মাস্ক এবং পরনে নীল রঙের শার্ট দেখা গেছে।
তবে ছিনতাইয়ের মূল মুহূর্তটি এখনো কোনো সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি মোটরসাইকেলটির নম্বর প্লেটও অস্পষ্ট হওয়ায় শনাক্তে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
মামলা, গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল
শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম জানান, শনিবার ভোর ৫টা ৫৩ থেকে ৫৪ মিনিটের দিকে মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে।
নিহত শিক্ষিকার স্বামী আব্দুল মতিন বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেছেন। মামলাটি ২৩ নম্বরে নথিভুক্ত হয়েছে। আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। পুলিশ ছাড়াও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও র্যাব তদন্তে কাজ করছে।
তিনি জানান, মোটরসাইকেলটি শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তবে নম্বর প্লেট অস্পষ্ট এবং চালকের মাথায় হেলমেট ও পেছনে থাকা ব্যক্তির মুখে মাস্ক থাকায় তাদের শনাক্ত করতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।
মোবাইল ফোনের অবস্থান মিরপুরে
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রনজিলা পারভীনের ভ্যানিটি ব্যাগে একাধিক মোবাইল ফোন ও কিছু টাকা ছিল। ঘটনার পর তার একটি মোবাইল ফোনের সর্বশেষ অবস্থান মিরপুর এলাকায় শনাক্ত করা হয়। পরে সেটি বন্ধ হয়ে যায়।
ফোনের অবস্থান, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ঘটনাস্থলের আশপাশের তথ্য বিশ্লেষণ করে ছিনতাইকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন
রাজধানীর ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকায় ভোরের দিকে এমন ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে রিকশায় চলাচলকারী যাত্রীদের কাছ থেকে ব্যাগ বা মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় অনেক সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়।
রনজিলা পারভীনের মৃত্যু সেই ঝুঁকিরই মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে সামনে এসেছে। পরিবারের কাছে এটি শুধু একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা নয়; চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসা একজন কর্মজীবী নারীর আকস্মিক ও অপূরণীয় মৃত্যু।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের অবস্থান ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

