ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

পাটের ফলন কম, ন্যায্যমূল্য নিয়ে শঙ্কা—দুঃস্বপ্নে কৃষকের ‘সোনালি আঁশ’

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৭, ২০২৬, ১০:৩২ এএম

পাটের ফলন কম, ন্যায্যমূল্য নিয়ে শঙ্কা—দুঃস্বপ্নে কৃষকের ‘সোনালি আঁশ’

ছবিঃ সংগৃহীত

চলতি মৌসুমে পাটের আশানুরূপ ফলন না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন লালমনিরহাটের পাটচাষিরা। শুরুতে খরা, পরে অতিবৃষ্টি ও রোগবালাইয়ের প্রকোপ—সব মিলিয়ে অনেক এলাকায় পাটের গাছ প্রত্যাশিত আকারে বেড়ে ওঠেনি। ফলে কমেছে ফলন ও আঁশের মান। এর ওপর বাজারে পাটের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকেরা।

কৃষকদের আশঙ্কা, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাটের দাম না মিললে এবারও লোকসান গুনতে হবে। এতে আগামী মৌসুমে জেলার অনেক কৃষক পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। একসময় কৃষকের কাছে ‘সোনালি আঁশ’ হিসেবে পরিচিত পাট এখন তাদের অনেকের কাছে লোকসানের ফসল হয়ে দাঁড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চরাঞ্চলে পাট চাষে আগ্রহ, কিন্তু ফলনে হতাশা

লালমনিরহাটের আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা, পাটগ্রাম ও সদর উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল ও গ্রামে এবার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। বিশেষ করে তিস্তা, ধরলা ও সানিয়াজান নদীর চরাঞ্চলের অনাবাদি ও বন্যাপ্রবণ জমিতে পাট চাষ করেছেন কৃষকেরা।

যেসব জমিতে ধানসহ অন্যান্য ফসলের ফলন তুলনামূলক কম হয়, সেসব জমিতেও পাট চাষকে লাভজনক বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন অনেকে। কিন্তু মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টির ঘাটতি ও খরার কারণে কিছু এলাকায় সেচ দিতে হয়েছে। পরে অতিবৃষ্টিতে অনেক জমিতে পানি জমে যায়। এতে পাটের গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

কৃষকদের ভাষ্য, শুধু ফলন কমেনি, অনেক এলাকায় পাটের আঁশের মানও প্রত্যাশিত হয়নি। ফলে বাজারে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

জাগ দেওয়া নিয়ে ব্যস্ত কৃষক

সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও পাট কাটা শেষ হয়েছে, আবার কোথাও চলছে পাট কাটার কাজ। অধিকাংশ কৃষক এখন পাট জাগ দেওয়া বা পচানোর কাজে ব্যস্ত।

পাট কাটার পর কৃষকেরা ডোবা, নালা, পুকুর, খাল-বিল কিংবা অন্যান্য জলাশয়ে পাটের আঁটি বিশেষ কায়দায় স্তূপ করে রাখছেন। সাধারণত ২০ থেকে ২৫ দিন পানিতে রাখার পর পাটে প্রয়োজনীয় পচন ধরলে আঁশ ছাড়ানো হয়। এরপর পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে বাজারজাতের জন্য প্রস্তুত করেন কৃষকেরা।

তবে এ বছর পর্যাপ্ত ও পরিষ্কার পানির সংকটও কিছু এলাকায় পাট জাগ দেওয়ার প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলেছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা।

উৎপাদন খরচ বাড়লেও দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা

পাটচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিকের মজুরি, পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানো—প্রতিটি ধাপেই খরচ বেড়েছে।

কৃষকদের অভিযোগ, গত কয়েক বছর ধরে উৎপাদন খরচের তুলনায় পাটের দাম অনেক সময় আশানুরূপ পাওয়া যায়নি। ফলে পাট বিক্রি করেও প্রত্যাশিত লাভ হয়নি। কোনো কোনো মৌসুমে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হয়েছে তাদের।

এবার ফলন কম হওয়ায় একই সঙ্গে দুটি চাপের মুখে পড়েছেন তারা—একদিকে উৎপাদন কম, অন্যদিকে বাজারদর নিয়ে অনিশ্চয়তা।

মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ

পাটের বাজার নিয়েও কৃষকদের মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ। তাদের অভিযোগ, মৌসুমের শুরুতে স্থানীয় ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। অনেক সময় তারা একসঙ্গে কম দামে পাট কেনার চেষ্টা করেন। এতে কৃষকেরা ন্যায্য দাম না পেয়ে বাধ্য হয়ে পাট বিক্রি করেন।

কৃষকদের দাবি, মাঠপর্যায়ে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পাট কেনার ব্যবস্থা করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে। পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে পাটের একটি যৌক্তিক ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হলে কৃষকের লোকসান অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।

সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা চান চাষিরা

পাটচাষিদের দাবি, ধান ও গমের মতো পাটের ক্ষেত্রেও কার্যকর সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এতে কৃষক উৎপাদনের আগে বাজার নিয়ে নিশ্চিত হতে পারবেন এবং ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে।

একই সঙ্গে উন্নতমানের বীজ, কৃষি উপকরণ, প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা প্রকৃত পাটচাষিদের মধ্যে স্বচ্ছতার সঙ্গে বিতরণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

আদিতমারী উপজেলার পাটচাষি আব্দুল আহাদ বলেন, প্রকৃত পাটচাষিদের প্রশিক্ষণ, উন্নতমানের বীজ ও কৃষি উপকরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। যারা বাস্তবে পাট চাষ করেন, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব সুবিধা দেওয়া হলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

কালীগঞ্জের কৃষক আব্দুর রাসেল বলেন, “পাটের জমিতে পানি জমে থাকায় এবার গাছ ভালোভাবে বড় হয়নি। ফলে পাটের আঁশও ভালো হয়নি। উৎপাদন কম হওয়ায় এবারও লোকসানের আশঙ্কা করছি।”

চরাঞ্চলের কৃষক রমনী কান্ত বলেন, “প্রতিবার আশা নিয়ে পাট চাষ করি, কিন্তু অনেক সময় লোকসান হয়। অতিবৃষ্টির কারণে এবার পাটের গাছ আশানুরূপ বড় হয়নি। সরকার পাটের দাম নির্ধারণ করে দিলে কৃষকের কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।”

লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আবাদ

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ৪ হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। এ বছর পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ১০ হেক্টর। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৫ হেক্টর বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে।

জেলায় মূলত তোশা পাট, দেশি পাট ও কেনাফ—এই তিন ধরনের পাট চাষ করা হয়।

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. মতিউল আলম বলেন, চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে পাট চাষ হয়েছে। তবে অতিবৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় পাটের ফলন কিছুটা কম হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী মৌসুমে ফলন ভালো হওয়ার আশা রয়েছে।

কৃষকের সোনালি আঁশের স্বপ্ন টিকবে তো?

লালমনিরহাটে পাট চাষের জমি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বাড়লেও উৎপাদন ও বাজারদর নিয়ে কৃষকদের উদ্বেগ কাটেনি। কৃষকদের মতে, শুধু পাট উৎপাদন বাড়ালেই হবে না—উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম নিশ্চিত করাও জরুরি।

ন্যায্যমূল্য, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা, উন্নত বীজ ও কৃষি সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে পাট চাষে কৃষকের আগ্রহ কমে যেতে পারে। এতে একদিকে কৃষকের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে দেশের ঐতিহ্যবাহী এই ‘সোনালি আঁশ’ উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!