টানা ভারী বৃষ্টি ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় লালমনিরহাটে সবজি চাষে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় সবজির জমিতে পানি জমে থাকায় উৎপাদন কমেছে, নষ্ট হয়েছে বহু খেত। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য নতুন করে ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বুধবার (২২ জুলাই) জেলার সদর, কালীগঞ্জ, আদিতমারী, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় প্রতিটি সবজির দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার খরচ আরও বেড়ে গেছে।
জলাবদ্ধতায় নষ্ট হচ্ছে সবজির খেত
জেলার কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোতে বর্ষার অতিবৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলের সবজিক্ষেত পানির নিচে চলে গেছে। অনেক জমিতে দীর্ঘসময় পানি জমে থাকায় গাছ পচে নষ্ট হয়ে গেছে। বিশেষ করে ঝিঙা, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, বরবটি, বেগুন, শসাসহ মৌসুমি সবজির উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেসব সবজির উৎপাদনকাল শেষের দিকে ছিল, সেগুলো অতিরিক্ত বৃষ্টিতে দ্রুত নষ্ট হয়েছে। অনেক কৃষক এখন সেই জমিতে আমন ধান রোপণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ নতুন করে সবজির বীজ বপনের উদ্যোগ নিচ্ছেন।
বাজারে সরবরাহ কম, বাড়ছে দাম
লালমনিরহাটের তুষভান্ডার, কালীগঞ্জ ও সদর বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সপ্তাহখানেক আগে ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া ঝিঙা, চিচিঙ্গা ও ধুন্দল এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে।
একইভাবে বেগুন ও বরবটির দাম ৫০-৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০-৮০ টাকায় উঠেছে। শসা ও টমেটোর দামও এখন কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ টাকা, যা গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, খেত থেকে পর্যাপ্ত সবজি না আসায় পাইকারি বাজারেই দাম বেড়েছে। ফলে খুচরা পর্যায়ে আরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
ক্রেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ
সবজির দাম বাড়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। অনেকেই আগের তুলনায় অর্ধেক পরিমাণ সবজি কিনে বাড়ি ফিরছেন।
কালীগঞ্জ বাজারে সবজি কিনতে আসা রহিম উদ্দিন ভুঁইয়া বলেন, "গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় সব সবজির দাম ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। অতিবৃষ্টিতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমাদের বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে।"
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য
তুষভান্ডার বাজারের ভ্রাম্যমাণ সবজি বিক্রেতা সফিকুল মিয়া বলেন, "তিন-চার দিনের মধ্যে পাইকারি বাজারেই প্রতি পাল্লা (পাঁচ কেজি) সবজির দাম ৫০ থেকে ৭০ টাকা বেড়েছে। তাই বাধ্য হয়ে খুচরা বাজারেও বেশি দামে বিক্রি করছি।"
পাইকারি ব্যবসায়ী আলম মিয়া বলেন, "বৃষ্টিতে অনেক কৃষকের সবজি নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক জমিতে এখনও পানি জমে আছে। তাই বাজারে সরবরাহ কমে গেছে, যার কারণে দামও বেড়েছে।"
কৃষি বিভাগের বক্তব্য
লালমনিরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাইখুল আরিফিন বলেন, জেলার সবজি খাতে বড় ধরনের ক্ষতির তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। তবে নিম্নাঞ্চলের কিছু বীজতলা ও মেয়াদ শেষের দিকে থাকা সবজির খেত অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, "অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে আমন ধান রোপণ করবেন। আবার অনেকে নতুন করে সবজি উৎপাদনের জন্য বীজ বপন করবেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে দ্রুতই উৎপাদন স্বাভাবিক হয়ে আসবে।"
উদ্বেগ বাড়ছে ভোক্তাদের
স্থানীয়দের আশঙ্কা, আগামী কয়েকদিনও যদি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকে, তাহলে সবজির উৎপাদন আরও কমে যেতে পারে। এতে বাজারে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হবে এবং দাম আরও বাড়তে পারে। তাই কৃষক ও ভোক্তা—উভয় পক্ষই এখন অনুকূল আবহাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

