পদ্মা সেতু ও রেল যোগাযোগ চালু হওয়ার পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলাকে ঘিরে যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল, বাস্তবে তার পূর্ণ প্রতিফলন এখনো দেখা যাচ্ছে না। বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও পশুর নদী ও আন্তর্জাতিক নৌপথ মোংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলের নাব্যতা সংকট, কাস্টমস-সংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রশাসনিক জটিলতায় বন্দরের কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না।
ফলে বড় জাহাজ চলাচল, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম এবং সরকারি রাজস্ব আদায়—সব ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়ছে। ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত এসব সমস্যা সমাধান করা না গেলে সরকারের হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগও কাঙ্ক্ষিত সুফল বয়ে আনবে না।
নাব্যতা সংকটে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন
ব্যবসায়ীরা জানান, পশুর নদী এবং মোংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলে নিয়মিত পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় অধিক ড্রাফটের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ সরাসরি বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারছে না। বাধ্য হয়ে অনেক জাহাজকে বহির্নোঙরে অবস্থান করে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করতে হচ্ছে।
এতে পণ্য পরিবহনের সময় যেমন বেড়ে যাচ্ছে, তেমনি পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতিরিক্ত এই ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত আমদানিকারক, রপ্তানিকারক এবং ভোক্তাদের ওপরই পড়ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
ড্রেজিং প্রকল্প চলমান, তবে সুফল পেতে অপেক্ষা
নাব্যতা সংকট দূর করতে ইতোমধ্যে দুটি ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে আরও একটি বৃহৎ ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ চুক্তি করেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারবে। তবে প্রকল্পটির পূর্ণ সুফল পেতে এখনও কিছুটা সময় লাগবে।
কাস্টমস জটিলতায় ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি
নাব্যতা সংকটের পাশাপাশি কাস্টমসের প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘ শুল্কায়ন প্রক্রিয়া এবং পণ্য ছাড়ে বিলম্বের কারণে ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
তাদের অভিযোগ, একটি চালান ছাড় করতে একাধিক দপ্তরে ঘুরতে হয়। ফলে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসার ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। এ কারণে অনেক আমদানিকারক মোংলা বন্দরের পরিবর্তে বিকল্প সমুদ্রবন্দর ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
ব্যবসায়ীদের মতে, বন্দরের আধুনিক অবকাঠামো থাকলেও যদি পণ্য খালাস ও কাস্টমস প্রক্রিয়া দ্রুত না হয়, তাহলে মোংলা বন্দরের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো কঠিন হবে।
ডিজিটাল সেবা চালুর উদ্যোগ
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কাস্টমসের প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে সমন্বয় করে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে ডিজিটাল ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) চালুর প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এটি চালু হলে ব্যবসায়ীরা দ্রুত পণ্য ছাড় করতে পারবেন এবং প্রশাসনিক জটিলতাও অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া ২৪ ঘণ্টা পণ্য খালাস সুবিধা চালু, জেটি ও টার্মিনালের আধুনিকায়ন এবং বন্দরের ব্যবহার ব্যয় কমানোর উদ্যোগও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
রেল সংযোগের পূর্ণ সুফল পেতে নতুন পরিকল্পনা
পদ্মা সেতু ও রেল যোগাযোগ চালুর ফলে মোংলা বন্দরের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের যোগাযোগ সহজ হয়েছে। এই সুবিধাকে আরও কার্যকর করতে বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে বিশেষ ট্যারিফ বা ভাড়া ছাড়ের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
একই সঙ্গে কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় সমন্বয় সভার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে দ্রুত সমস্যাগুলোর সমাধান করা যায়।
আশাবাদ বন্দর কর্তৃপক্ষের
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, সরকারের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বন্দরের নাব্যতা, জাহাজ চলাচল এবং পণ্য খালাস ব্যবস্থা আরও উন্নত হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থা চালু হলে ব্যবসায়ীদের সময় ও ব্যয় কমবে এবং রাজস্ব আদায়ও বাড়বে।
তাদের আশা, চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পন্ন হলে মোংলা বন্দর ধীরে ধীরে একটি আধুনিক, আন্তর্জাতিক মানের সমুদ্রবন্দরে পরিণত হবে এবং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

