ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

ভ্যাট অটোমেশনে ৩৪৭ কোটি টাকার ব্যর্থতা, বছরে বেহাত লাখ কোটি টাকার রাজস্ব

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: জুলাই ২১, ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম

ভ্যাট অটোমেশনে ৩৪৭ কোটি টাকার ব্যর্থতা, বছরে বেহাত লাখ কোটি টাকার রাজস্ব

ছবিঃ সংগৃহীত

মুক্তবাজার অর্থনীতিতে আমদানি শুল্কের ওপর নির্ভরতা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এখন সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। জাতীয় রাজস্ব আয়ের ২৫ শতাংশেরও বেশি আসে ভ্যাট থেকে। অথচ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ভ্যাট ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে গত দেড় দশকে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করেও প্রত্যাশিত সফলতা অর্জন করতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

সরকারি তথ্য, মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) ও পরবর্তীতে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) প্রকল্পে প্রায় ৩৪৭ কোটি টাকা ব্যয় হলেও তা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এর ফলে খুচরা ও পাইকারি বাজারে ভ্যাট ফাঁকি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ক্রেতারা শতভাগ ভ্যাট পরিশোধ করলেও সেই অর্থের বড় অংশ সরকারি কোষাগারে না গিয়ে চলে যাচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিবাজ চক্রের হাতে।

বছরে সম্ভাব্য ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা, আদায় মাত্র ৫ হাজার কোটি

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৭৫ লাখ খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ী রয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, এ খাত থেকে বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

কিন্তু এনবিআরের হিসাবে বর্তমানে আদায় হচ্ছে মাত্র ৫ হাজার কোটি টাকা, যা সম্ভাব্য রাজস্বের মাত্র ৩ শতাংশ। অর্থাৎ সম্ভাব্য ভ্যাটের প্রায় ৯৭ শতাংশই বিভিন্ন কৌশলে ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল রাজস্ব হারানোর মূল কারণ ইএফডি যন্ত্র ব্যবহার না করা, নকল বিল প্রদান, দুর্বল তদারকি, মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার।

দেড় দশকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কিন্তু সফলতা নেই

২০০৭-০৮ অর্থবছরে প্রথমবার ইসিআর চালু করে এনবিআর। কিন্তু কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে সংযোগ না থাকা, তদারকির অভাব এবং ব্যবসায়ীদের অনীহার কারণে প্রকল্পটি ব্যর্থ হয়।

এরপর ২০১৮ সালে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে চালু করা হয় ইএফডি (Electronic Fiscal Device) ও এসডিসি (Sales Data Controller)।

প্রথমে ব্যবসায়ীদের নিজ খরচে যন্ত্র কেনার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হলেও পরে বিনামূল্যে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

তিন লাখ মেশিনের লক্ষ্য, বসেছে মাত্র ১৫ হাজার

২০২২ সালে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেডের সঙ্গে ১০ বছরের চুক্তি করে এনবিআর।

চুক্তি অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রামে পাঁচ বছরে ৩ লাখ ইএফডি মেশিন স্থাপন করার কথা ছিল। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও স্থাপন করা হয়েছে মাত্র ১১ থেকে ১৫ হাজার মেশিন।

মাঠপর্যায়ে স্থাপিত যন্ত্রগুলোর বড় অংশই বর্তমানে অকার্যকর অথবা বন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

ভ্যাট চুরির নতুন কৌশল: ‍‍`প্যারালাল বিলিং‍‍`

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে ভয়ংকর এক প্রতারণার চিত্র।

অনেক ব্যবসায়ী ইএফডি ব্যবহার না করে নিজেদের সফটওয়্যার দিয়ে এনবিআরের রসিদের মতো দেখতে নকল বিল তৈরি করছেন।

এসব বিলে ভ্যাটের পরিমাণ উল্লেখ থাকলেও তা এনবিআরের সার্ভারে যায় না। ফলে ক্রেতার কাছ থেকে ভ্যাট নেওয়া হলেও পুরো অর্থ ব্যবসায়ীর পকেটে চলে যায়।

ভ্যাট গোয়েন্দাদের অভিযানে গত পাঁচ বছরে ১২৬টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ১ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির প্রমাণ পাওয়া গেছে।

মাঠপর্যায়ে চলছে প্রকাশ্য অনিয়ম

রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, বেইলি রোড, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানে ইএফডি মেশিন থাকলেও তা বন্ধ রাখা হয়।

অজুহাত হিসেবে দেখানো হয়—

সার্ভার ডাউন
ইন্টারনেট নেই
বিদ্যুৎ নেই
মেশিন নষ্ট

অন্যদিকে অধিকাংশ ক্রেতাও ইএফডি রসিদ সংগ্রহ করেন না। এই সুযোগে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট গোপন করা হচ্ছে।

লটারি দিয়েও বদলানো যায়নি চিত্র

২০২১ সালে ক্রেতাদের ইএফডি রসিদ নিতে উৎসাহিত করতে লটারির ব্যবস্থা চালু করে এনবিআর।

প্রতি মাসে লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করা হলেও পর্যাপ্ত সাড়া না পাওয়ায় পরে সেই কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সচেতনতার অভাব এবং জটিল প্রক্রিয়ার কারণে এই উদ্যোগও ব্যর্থ হয়।

বিদেশে সফল, বাংলাদেশে কেন ব্যর্থ?

রুয়ান্ডা, পর্তুগাল, উগান্ডা, কেনিয়া ও তানজানিয়ার মতো দেশে একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভ্যাট আদায়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে।

এসব দেশে ই-ইনভয়েসিং, রিয়েল-টাইম ডেটা ট্র্যাকিং, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, এআই প্রযুক্তি এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কর ফাঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে শুধু যন্ত্র বসানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কার্যকর মনিটরিং, তথ্য সমন্বয় এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মত

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,

"শুধু প্রযুক্তি আনলেই হবে না। প্রযুক্তির সঙ্গে সুশাসন, স্বচ্ছতা, এআই-ভিত্তিক নজরদারি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।"

কর বিশেষজ্ঞ ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন,

"ইএফডি ব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক এআই প্রযুক্তি ও ই-ইনভয়েসিং সমন্বয় করা না হওয়ায় প্রকল্পটি সফল হয়নি।"

অন্যদিকে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, দুর্বল কমিশন কাঠামো, দক্ষ জনবলের অভাব এবং তদারকির ঘাটতিই প্রকল্পটিকে ব্যর্থ করেছে।

প্রশ্নের মুখে এনবিআরের অটোমেশন

বিশ্লেষকদের মতে, ইএফডি প্রকল্পে শত শত কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাস্তবে ভ্যাট আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। বরং দুর্বল নজরদারি, প্রশাসনিক অদক্ষতা, ব্যবসায়ীদের অনিয়ম এবং প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতায় দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রাজস্ব খাত এখনো বড় ধরনের ফাঁকির মধ্যে রয়েছে।

তাদের মতে, ভ্যাট ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে কেবল নতুন যন্ত্র বসানো নয়; বরং এআই-ভিত্তিক রিয়েল-টাইম মনিটরিং, কঠোর আইন প্রয়োগ, তথ্যভাণ্ডারের সমন্বয় এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে ভোক্তার দেওয়া ভ্যাটের অর্থ ভবিষ্যতেও সরকারি কোষাগারে না গিয়ে অসাধু চক্রের হাতেই চলে যাবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!