মাঠপর্যায়ের রাজস্ব কর্মকর্তাদের আইনি অদক্ষতা, পদ্ধতিগত ত্রুটি, দায়িত্বে অবহেলা এবং উচ্চ আদালতে সময়মতো প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য উপস্থাপনে ব্যর্থতার কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সংস্থাটির নিজস্ব অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে এসেছে, কর্মকর্তাদের আইনের ভুল প্রয়োগ, অদূরদর্শিতা এবং কিছু ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকাণ্ডের কারণে একের পর এক মামলা উচ্চ আদালতে টিকছে না। এতে যেমন সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি করদাতা ও ব্যবসায়ীরাও অযথা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
এনবিআরের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত প্রতিবেদনে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা, আইনি জ্ঞান এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে কঠোর নির্দেশনা জারির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
ভুল আইনি প্রয়োগে বারবার হারছে এনবিআর
তদন্তে বলা হয়েছে, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ৫৫ ধারা অনুযায়ী করদাতার প্রকৃত কর দায় নির্ধারণ না করেই অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি ৩৭ ধারায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা মামলা করা হচ্ছে। অথচ আইনি বিধান অনুযায়ী প্রথমে করের পরিমাণ নির্ধারণ এবং কর ফাঁকির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নিশ্চিত করার পরই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
এই মৌলিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় অধিকাংশ মামলা উচ্চ আদালতে টিকছে না। আদালত আইনি ত্রুটির কারণে মামলাগুলো বাতিল করে দিচ্ছেন এবং রাষ্ট্র কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
কাস্টমসে সময়মতো নথি না পৌঁছানোয় ব্যর্থ হচ্ছে আপিল
তদন্ত প্রতিবেদনে কাস্টমস বিভাগের একাধিক গুরুতর দুর্বলতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কর ফাঁকি বা শুল্ক-সংক্রান্ত মামলার গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র অনেক ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারি আইন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয় না।
ফলে উচ্চ আদালতে আপিল দাখিলে কারিগরি ত্রুটি থেকে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আপিল করার নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যাওয়ার পর নথি পৌঁছানোর কারণে রাষ্ট্রপক্ষ আইনি লড়াইয়ের সুযোগই হারাচ্ছে।
এছাড়া বন্ড লাইসেন্স স্থগিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন ও বিধি অনুসরণ না করে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য লাইসেন্স ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগও পাওয়া গেছে। কাস্টমস অ্যাক্ট, ১৯৬৯-এর ধারা ১৩(৩) এবং কাস্টমস অ্যাক্ট, ২০২৩-এর ধারা ১২ অনুযায়ী কমিশনারের নির্দিষ্ট ক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘন করে দীর্ঘ সময় লাইসেন্স স্থগিত রাখার কারণে উচ্চ আদালতে একের পর এক রিট দায়ের হচ্ছে।
আয়করে তথ্য ছাড়াই ব্যাংক হিসাব জব্দের অভিযোগ
আয়কর বিভাগ সম্পর্কেও তদন্ত প্রতিবেদনে গুরুতর পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই করদাতাদের ব্যাংক হিসাব স্থগিত করা হয়েছে। এমনকি করদাতার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট নন—এমন স্বজন বা পরিচিত ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবও জব্দ করার অভিযোগ রয়েছে।
`এ.এ.এ. বনাম এনবিআর` (রিট পিটিশন নং-১৯৮২৪/২০২৫) মামলার রায়ে হাইকোর্ট উল্লেখ করেন, আয়কর আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করায় ব্যাংক হিসাব স্থগিতের আদেশ অবৈধ ও অকার্যকর।
তদন্তে বলা হয়েছে, কোনো প্রাথমিক তথ্য বা বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই ব্যাংক হিসাব জব্দ করে পরে তথ্য খোঁজার চেষ্টা করা আইনের ভুল ব্যাখ্যা এবং প্রশাসনিক অদূরদর্শিতার পরিচায়ক।
করদাতা হয়রানির অভিযোগ
ব্যবসায়ী নেতাদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা আইনের যথাযথ প্রয়োগের পরিবর্তে অপব্যবহার করছেন। এতে কর আদায়ের পরিবর্তে হয়রানি, অনৈতিক সুবিধা আদায় এবং অযৌক্তিক মামলা বৃদ্ধির প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না করে অনেক ক্ষেত্রে অপব্যবহার করা হচ্ছে।
তার ভাষায়, "যখন কোনো সমঝোতা হয় না বা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়া যায় না, তখনই অনেক ক্ষেত্রে আইনকে ব্যবহার করে হয়রানি করা হয়। প্রকৃত মামলার তুলনায় হয়রানিমূলক মামলাই বেশি।"
তিনি বলেন, ব্যবসায়ী সমাজ সঠিকভাবে কর পরিশোধে আগ্রহী। তবে এজন্য কর প্রশাসনের আচরণ, জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
`অনৈতিক সুবিধার জন্য মামলা দেওয়া হয়`
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম অভিযোগ করেন, আইনের অস্পষ্টতা, কিছু কর্মকর্তার অজ্ঞতা এবং অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতার কারণে অনেক অযৌক্তিক মামলা সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, অনেক সময় ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা হয় এবং অনৈতিক সুবিধা না পেলে হয়রানিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
তার মতে, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মানসিকতা ও জবাবদিহির পরিবর্তন ছাড়া ব্যবসাবান্ধব কর প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম মনে করেন, কর কর্মকর্তাদের দক্ষতা, আইনি জ্ঞান ও বিচার-বিবেচনার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
তিনি বলেন, "যারা মামলা করবেন, তাদের আইন সম্পর্কে পূর্ণ দক্ষতা থাকতে হবে। অন্যথায় করদাতা হয়রানির পাশাপাশি সরকারের রাজস্বও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।"
তার মতে, কর প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আইনের অপব্যবহার বন্ধে কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, তদন্তে চিহ্নিত অনিয়ম ও দুর্বলতা দূর করতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব আদায় বাড়াতে শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না; মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে একদিকে যেমন সরকারের হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হাতছাড়া হবে, অন্যদিকে ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

