মাত্র ১৯ একর জায়গার ওপর পরিচালিত হচ্ছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর সোনামসজিদ স্থলবন্দর। দীর্ঘদিনের জায়গা সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং জমি অধিগ্রহণে বিলম্বের কারণে বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম দিন দিন ধীরগতির হয়ে পড়ছে। এতে পণ্য খালাসে বিলম্ব, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, যানজট এবং রাজস্ব ঘাটতির পাশাপাশি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে কাজ হারাচ্ছেন শত শত শ্রমিক।
জায়গা সংকটে থমকে বন্দর কার্যক্রম
বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান,পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় ট্রাক প্রবেশ, অবস্থান, পণ্য খালাস ও ছাড়করণ প্রতিটি ধাপেই জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। বন্দরের ইয়ার্ডে জায়গা না থাকায় ভারত থেকে আসা অধিকাংশ পাথরবোঝাই ট্রাককে সড়কের পাশে কিংবা আশপাশের আমবাগানে পণ্য খালাস করতে হচ্ছে। এতে কানসাট-সোনামসজিদ সড়কে প্রায়ই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষও ভোগান্তিতে পড়ছেন।
তিন বছর ধরে বন্ধ ফল আমদানি

বন্দর সূত্র জানায়,গত তিন বছর ধরে সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে ফল আমদানি বন্ধ রয়েছে। জায়গা সংকট নিরসনে অতিরিক্ত প্রায় ২২ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হলেও এখনো অনুমোদন মেলেনি। ফলে বাণিজ্যের পরিধি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
ব্যবসায়ীদের বাড়ছে লোকসান
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্য খালাসে বিলম্বের কারণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে সময়মতো পণ্য পৌঁছানো যাচ্ছে না। এতে পরিবহন ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন আমদানিকারকরা।
জে এইচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী সাঈদী ইসলাম বলেন,বন্দরের সবচেয়ে বড় সমস্যা জায়গার সংকট। পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ফল আমদানির জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এ খাতের ব্যবসাও বন্ধ রয়েছে।
ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বলেন,দেশের অন্যান্য স্থলবন্দরের তুলনায় সোনামসজিদে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় ব্যবসায়ীরা এ বন্দর ব্যবহার করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
কাজ হারাচ্ছেন শ্রমিকরা
একসময় সোনামসজিদ স্থলবন্দরে প্রতিদিন প্রায় ১,৫০০ থেকে ১,৬০০ শ্রমিক কাজ করলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে ৫০০-৬০০ জনে নেমে এসেছে।
শ্রমিক আব্দুর রহিম বলেন,আগে প্রতিদিন ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা আয় হতো। এখন সারাদিন অপেক্ষা করেও ১৫০ থেকে ২০০ টাকার বেশি আয় হয় না। এতে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বেনাপোলের তুলনায় অনেক পিছিয়ে
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আব্দুল আউয়াল বলেন, যেখানে বেনাপোল স্থলবন্দরের আয়তন প্রায় সাড়ে ৩০০ একর,সেখানে সোনামসজিদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের জায়গা মাত্র ১৯ একর। এত অল্প জায়গা নিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা কার্যত অসম্ভব।
সোনামসজিদ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন বলেন,দ্রুত জমি অধিগ্রহণ,আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা না হলে এ বন্দরের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও কমে যাবে।
২২ একর জমির প্রস্তাব ঝুলে আছে
বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পানামা সোনামসজিদ পোর্ট লিংক লিমিটেডের ম্যানেজার মাইনুল ইসলাম জানান,অতিরিক্ত ২২ একর জমি অধিগ্রহণের আবেদন অনেক আগে করা হলেও এখনো সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া যায়নি। জায়গার অভাবে ট্রাক ইয়ার্ডে রাখা সম্ভব হচ্ছে না,ফলে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
রাজস্ব আদায়ে ২১৪ কোটি টাকার ঘাটতি
সোনামসজিদ কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা মো.হুমাউর কবির জানান,ফল আমদানি বন্ধ থাকা,জ্বালানি সংকট এবং আমদানি কার্যক্রমে স্থবিরতার কারণে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি হয়েছে।
তার তথ্য অনুযায়ী,২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ১২২ কোটি ৪১ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯০৭ কোটি ৮০ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, ফলে ২১৪ কোটি ৬১ লাখ ১২ হাজার টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ী ও বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে,দ্রুত জমি অধিগ্রহণ,আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা না গেলে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

