ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

সৌন্দর্যের আড়ালে নীরব বিষ: ৮ ব্র্যান্ডের স্কিন ক্রিমে বিপজ্জনক মার্কারি, সতর্ক করল বিএসটিআই

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: আগস্ট ৪, ২০২৬, ০৫:১৩ পিএম

সৌন্দর্যের আড়ালে নীরব বিষ: ৮ ব্র্যান্ডের স্কিন ক্রিমে বিপজ্জনক মার্কারি, সতর্ক করল বিএসটিআই

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের বাজারে অবৈধভাবে আমদানি ও বিক্রি হওয়া বেশ কয়েকটি ত্বক ফর্সাকারী (স্কিন হোয়াইটেনিং) ক্রিমে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় অত্যন্ত বিপজ্জনক মাত্রার মার্কারি (Mercury) শনাক্ত হয়েছে। মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এই ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়ার পর ৮টি ব্র্যান্ডের স্কিন ক্রিমের বিক্রয়, বিপণন, মজুত ও ব্যবহার থেকে বিরত থাকার জন্য জনসাধারণের প্রতি জরুরি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় রাষ্ট্রীয় মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাটি।

অবৈধ পথে বাজারে আসছে প্রসাধনী

বিএসটিআই জানায়, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন বাজারে বিদেশি ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব পণ্যের অধিকাংশই বৈধ আমদানি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে লাগেজ, চোরাচালান কিংবা অন্যান্য অননুমোদিত পথে দেশে প্রবেশ করছে। ফলে এসব পণ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তা যাচাই করার সুযোগ থাকছে না।

এ অবস্থায় বাজার থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নমুনা সংগ্রহ করে বিএসটিআইয়ের পরীক্ষাগারে রাসায়নিক বিশ্লেষণ করা হলে উদ্বেগজনক ফলাফল পাওয়া যায়।

বিপজ্জনক মাত্রায় মার্কারি শনাক্ত

পরীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ মান (বিডিএস-১৩৮২) অনুযায়ী প্রসাধনীতে মার্কারির সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ১.০০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) হলেও পরীক্ষিত ৮টি ব্র্যান্ডে এর উপস্থিতি কয়েক দশক থেকে শতগুণ পর্যন্ত বেশি।

পরীক্ষায় যেসব পণ্যে বিপজ্জনক মাত্রার মার্কারি পাওয়া গেছে—

চাঁদনি হোয়াটেনিং ক্রিম (পাকিস্তান) – ১২০.৩৯ পিপিএম
নিউ ফেস বিউটি ক্রিম (পাকিস্তান) – ৪৪.৭২ পিপিএম
নাভিয়া বিউটি ক্রিম (পাকিস্তান) – ৫৯.৮২ পিপিএম
নাভিয়া হোয়াটেনিং ক্রিম (পাকিস্তান) – ৭৯.৭০ পিপিএম
নুর হোয়াটেনিং ক্রিম (পাকিস্তান) – ৮২.৭৬ পিপিএম
ডিউ বিউটি ক্রিম (পাকিস্তান) – ১২৩.৩৭ পিপিএম
গৌরি বিউটি ক্রিম (পাকিস্তান) – ৫৬.৯৩ পিপিএম
ন্যাচারাল পার্ল স্কিন ক্রিম (চীন) – ৬৭.৪৯ পিপিএম

বিএসটিআই বলছে, এসব পণ্যে মার্কারির মাত্রা অনুমোদিত সীমার বহু গুণ বেশি হওয়ায় এগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন মার্কারিযুক্ত প্রসাধনী ব্যবহার করলে ত্বকের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এছাড়া দেখা দিতে পারে—

ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়া
স্থায়ী কালো দাগ ও অ্যালার্জি
কিডনির মারাত্মক ক্ষতি
স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতা
হরমোনজনিত সমস্যা
গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে অনাগত শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা
দীর্ঘমেয়াদে বিষক্রিয়া ও অন্যান্য জটিল রোগের ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ত্বক ফর্সা করার নামে মার্কারি ব্যবহার বিশ্বজুড়েই একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচিত।

কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি বিএসটিআইয়ের

বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হক বলেন, জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই। ভোক্তার জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষাই বিএসটিআইয়ের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

তিনি বলেন, ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত প্রসাধনী উৎপাদন, আমদানি, মজুত বা বাজারজাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, বাজারে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, সার্ভিল্যান্স কার্যক্রম, বাজার তদারকি এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা আরও জোরদার করা হয়েছে।

ভোক্তাদের জন্য সতর্কবার্তা

বিএসটিআই ভোক্তাদের প্রতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে—

অনুমোদনহীন বা অজানা উৎসের স্কিন ক্রিম ব্যবহার না করা।
প্রসাধনী কেনার আগে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ও বৈধতা যাচাই করা।
চোরাই বা লাগেজে আনা বিদেশি প্রসাধনী কেনা থেকে বিরত থাকা।
সন্দেহজনক প্রসাধনী সম্পর্কে তথ্য থাকলে বিএসটিআইকে অবহিত করা।
বাজার তদারকি আরও জোরদারের দাবি

ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অবৈধ বিদেশি প্রসাধনীর বিক্রি দিন দিন বাড়ছে। তাই শুধু সতর্কতা নয়, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি, অনলাইন বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং নিয়মিত বাজার অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে এসব ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের বিস্তার রোধ করা জরুরি।

বিএসটিআই মনে করছে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর তদারকির মাধ্যমে ক্ষতিকর প্রসাধনীর অবাধ বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!