ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

নিষিদ্ধ ১১ পণ্য এখনো বাজারে, প্রত্যাহারে গড়িমসির অভিযোগ

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ১০:৩২ এএম

নিষিদ্ধ ১১ পণ্য এখনো বাজারে, প্রত্যাহারে গড়িমসির অভিযোগ

ছবিঃ সংগৃহীত

মান নির্ধারণে ব্যর্থ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ১১টি পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে সরকারের দুটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা—বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। তবে নির্দেশ জারির এক সপ্তাহ পার হলেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার দোকানে এসব পণ্য প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোম্পানিগুলোর ধীরগতির কারণে বাজারে এখনও ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য রয়ে গেছে। অন্যদিকে অনেক দোকানি দাবি করছেন, তারা পণ্য প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশ পাননি। ফলে আগের মতোই এসব পণ্য বিক্রি করছেন।

বিএফএসএর নির্দেশের পরও বিক্রি হচ্ছে কেক ও পাউরুটি

গত বৃহস্পতিবার অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ ব্যবহারের দায়ে তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাস্টার্ড কেক ও পাউরুটি বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)।

প্রত্যাহারের তালিকায় রয়েছে—

ইস্ট কেক ইন্টারন্যাশনাল ফুড লিমিটেডের ‘ইস্ট কেক পুর পিঠা জ্যাম ফিল্ড (ইনট্যাক্ট)’
ইস্ট জিবাই ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ‘ইস্ট বেকার স্লাইস ব্রেড মিল্ক জ্যাম ফিল্ড (ইনট্যাক্ট)’
আরবোটিং ফুড কোম্পানি লিমিটেডের ‘স্লাইস ব্রেড মিক্স জ্যাম’

বিএফএসএ শুধু বাজার থেকে পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশই দেয়নি, একইসঙ্গে এসব পণ্যের উৎপাদন, বিপণন ও বিতরণও বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক দোকানে এখনও এসব কেক ও পাউরুটি ঝুলিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।

মানহীন আট পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ বিএসটিআইয়ের

এর আগে গত সোমবার বিএসটিআই চারটি প্রতিষ্ঠানের আট ধরনের পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়।

এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে—

ফ্রেশ গার্ডেন অ্যাগ্রো রিসোর্সেস
কাজী ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড
অলিভ বাংলাদেশ লিমিটেড
ডেকো ফুডস লিমিটেড

এসব প্রতিষ্ঠানের জুস, আইসক্রিম, শ্যাম্পু, লোশনসহ আটটি পণ্য মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।

তবে নির্দেশনার তিন দিন পরও বাজারে এসব পণ্য বিক্রি হতে দেখা গেছে।

দোকানিরা জানেনই না পণ্য প্রত্যাহারের কথা

রাজধানীর রামপুরা, মধ্যবাড্ডা, জামতলাসহ বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ দোকানি পণ্য প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো লিখিত বা মৌখিক নির্দেশ পাননি।

রামপুরার এক দোকানি বলেন,
"ডিলার এখনো নিয়মিত পণ্য দিচ্ছে। কেউ এসে বলেনি এগুলো বিক্রি বন্ধ করতে। তাই আগের মতোই বিক্রি করছি।"

মধ্যবাড্ডার আরেক দোকানি আমিনুল বলেন,
"খবরে দেখেছি, কিন্তু কোম্পানির লোক আসেনি। তারা কিছু না বলায় পণ্য বিক্রি করছি।"

কোম্পানির দাবি—সারা দেশ থেকে পণ্য তুলতে সময় লাগবে

জিরাবো ও আশুলিয়া-সাভার বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিলেও ইস্ট কেক ইন্টারন্যাশনাল ফুড লিমিটেডের ‘ইস্ট কেক পুর পিঠা জ্যাম ফিল্ড (ইনট্যাক্ট)’ এবং ইস্ট জিবাই ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ‘ইস্ট বেকার স্লাইস ব্রেড মিল্ক জ্যাম ফিল্ড (ইনট্যাক্ট)’ এখনো বিভিন্ন মুদি ও কনফেকশনারি দোকানে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের কয়েকদিন পরও পণ্যগুলো বাজারে অবাধে বিক্রি হওয়ায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে জিরাবো এলাকার এক দোকানদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “খবরে দেখেছি যে কিছু পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোম্পানির কোনো প্রতিনিধি এখনো আমাদের কাছে আসেনি বা পণ্য ফেরত নেওয়ার বিষয়ে কিছু জানায়নি। তাই আগের মতোই পণ্য বিক্রি করছি।”

স্থানীয় ক্রেতাদের অভিযোগ, সরকারি নির্দেশনার পরও মানহীন ও নিষিদ্ধ ঘোষিত পণ্য বাজারে অবাধে বিক্রি হওয়ায় তারা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। দ্রুত এসব পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

ইস্ট গ্রুপের কমপ্লায়েন্স ম্যানেজার গোলাম ফারুক বলেন, নির্দেশ পাওয়ার পরপরই সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে এবং ডিলার ও বিক্রয় প্রতিনিধিদের বাজার থেকে পণ্য তুলে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তার ভাষ্য,
"একজন ডিলারের অধীনে শত শত দোকান থাকে। কয়েক দিনের মধ্যে সারাদেশ থেকে সব পণ্য প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়। শুধু ঢাকার দোকান থেকেই তুলতে সাত-আট দিন লেগে যেতে পারে।"

তবে বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেভাবে এক-দুই দিনের মধ্যে নতুন পণ্য দোকানে পৌঁছে যায়, একইভাবে চাইলে দ্রুত পণ্য প্রত্যাহারও সম্ভব। তাদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলো লোকসান কমাতে ইচ্ছাকৃতভাবে বাজারে পণ্য রেখে দিচ্ছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভোক্তারা

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মানহীন বা অনুমোদনহীন খাদ্যপণ্য দীর্ঘদিন খেলে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভযুক্ত খাদ্য শিশুদের জন্য বেশি ক্ষতিকর।

ভোক্তা অধিকারকর্মীদের মতে, পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে।

কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) শফিকুল ইসলাম বলেন,

"পণ্যগুলো বাজার থেকে তুলে নিতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদেরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। বাজারে এসব পণ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের এসব পণ্য না কেনার আহ্বান জানানো হচ্ছে।"

অন্যদিকে বিএসটিআইয়ের সার্টিফিকেশন মার্কস উইংয়ের পরিচালক মো. আলাউদ্দিন হুসাইন বলেন,

"পণ্য প্রত্যাহারের জন্য তিন দিন সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য না তুললে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। প্রয়োজন হলে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল, জেল ও জরিমানার মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

আইনে রয়েছে কঠোর শাস্তির বিধান

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন আইন-২০১৮ অনুযায়ী নিষিদ্ধ বা প্রত্যাহারযোগ্য পণ্য বাজারে রেখে বিক্রি করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা, অর্থদণ্ড, কারাদণ্ড এবং সনদ বাতিলসহ বিভিন্ন ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল নির্দেশনা জারি করলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারি ও নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে দ্রুত বাজার থেকে এসব পণ্য সরিয়ে ফেলতে হবে। অন্যথায় ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে না।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!