ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

নাটোরে ডায়রিয়ার প্রকোপ, ৩ দিনে ১৫০ রোগী; মেঝেতে চলছে চিকিৎসা

নাটোর প্রতিনিধি:

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ১১:০৬ এএম

নাটোরে ডায়রিয়ার প্রকোপ, ৩ দিনে ১৫০ রোগী; মেঝেতে চলছে চিকিৎসা

ছবিঃ সংগৃহীত

ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে নাটোরে হঠাৎ বেড়েছে ডায়রিয়ার প্রকোপ। গত তিন দিনে নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে অন্তত ১৫০ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। রোগী ভর্তি অব্যাহত থাকায় ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে দেখা দিয়েছে শয্যা সংকট। বাধ্য হয়ে অনেক রোগীকে ওয়ার্ডের পাশাপাশি করিডোর ও মেঝেতে শয্যা পেতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

আক্রান্তদের মধ্যে শিশু ও বয়স্ক রোগীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। ডায়রিয়ার পাশাপাশি বমি, পেটের সমস্যা, জ্বর ও দুর্বলতায় অনেক রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ, স্যালাইনের ক্যানুলা ও অ্যান্টিবায়োটিক বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন রোগী ও স্বজনরা। এতে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।

মেঝেতেই চলছে শিশুর চিকিৎসা

অনর্গল পাতলা পায়খানা ও বমিতে সাত বছরের শিশু আছিয়া প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে শুরু হয় তীব্র মাথাব্যথা ও জ্বর। মুমূর্ষু অবস্থায় শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ভোরে তাকে নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

তবে হাসপাতালে শয্যা খালি না থাকায় শিশুটির চিকিৎসা শুরু হয় মেঝেতে। শুধু আছিয়া নয়, একইভাবে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত আরও অনেক শিশু ও বয়স্ক রোগীকে মেঝেতে শয্যা পেতে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।

হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় জরুরি বিভাগ, ওয়ার্ডের আশপাশের করিডোর এবং বিভিন্ন ফাঁকা জায়গাতেও রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।

তিন দিনে অন্তত ১৫০ রোগী ভর্তি

হাসপাতালের ভর্তি রেকর্ড অনুযায়ী, বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত শিশু, নারী, পুরুষ ও বয়স্কসহ ৮৬ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে নারী ও শিশু ওয়ার্ডে ৪৭ জন এবং পুরুষ ওয়ার্ডে ৩৯ জন রোগী চিকিৎসা নেন।

এরপর বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত আরও প্রায় ৬৪ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সব মিলিয়ে তিন দিনে অন্তত ১৫০ জন রোগী ডায়রিয়া নিয়ে ভর্তি হয়েছেন।

এর বাইরে অনেক রোগী হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসা ও পরামর্শ নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। ফলে হাসপাতালে প্রকৃত আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ভর্তি রোগীর তুলনায় আরও বেশি হতে পারে।

শয্যা সংকটে বাড়ছে ভোগান্তি

শুক্রবার হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা যায়, নারী ও পুরুষ ওয়ার্ডের প্রায় সব শয্যাই রোগীতে পূর্ণ। অনেক রোগীর জন্য ওয়ার্ডের মেঝেতে বিছানা পাতা হয়েছে। কোথাও কোথাও পাশাপাশি একাধিক রোগীকে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে দেখা যায়।

হঠাৎ করে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসক ও নার্সদের ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে ডায়রিয়ার রোগীদের পাশাপাশি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত অন্য রোগীরাও চিকিৎসাধীন থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে সংশ্লিষ্টদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

দায়িত্বরত নার্স সারাহ আক্তার ও জেসমিন নাহার জানান, হঠাৎ করেই ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। রোগী ভর্তি অব্যাহত থাকায় জরুরি বিভাগ, ওয়ার্ডের আশপাশের করিডোর এবং মেঝেতেও রোগীদের শয্যা দিতে হচ্ছে।

তাঁরা বলেন, হাসপাতালে জনবল সংকটও রয়েছে। সীমিত সংখ্যক নার্স ও অন্যান্য কর্মী দিয়ে এত বেশি রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে তাঁদের বাড়তি চাপের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।

প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগ

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগীর স্বজন প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন।

নাটোর শহরের কানাইখালী এলাকার আয়শা আক্তার জানান, পেটে ব্যথা ও বমির কারণে তাঁর পুত্রবধূ ও মেয়েকে বৃহস্পতিবার ভোরে হাসপাতালে ভর্তি করেন। ভর্তির পর একটি স্যালাইন দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় অন্যান্য ওষুধ তাঁকে বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে।

তিনি প্রশ্ন করেন, সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও যদি প্রয়োজনীয় ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য বিষয়টি কতটা স্বস্তিদায়ক?

সদর উপজেলার ইসলাবাড়ী এলাকার আক্তার হোসেন জানান, তাঁর স্ত্রী রাবেয়া খাতুন ও চার বছরের শিশু সন্তান রাফি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে সকালে হাসপাতালে ভর্তি করেন। নার্সরা স্যালাইন হাতে ধরিয়ে দিলেও ক্যানুলা থেকে শুরু করে প্রেসক্রিপশনের অন্যান্য ওষুধ তাঁকেই কিনে আনতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

বড়াইগ্রাম উপজেলার বাসিন্দা বেলাল হোসেন বলেন, ডায়রিয়াজনিত অসুস্থতা নিয়ে তাঁর চাচা সালাম হোসেনকে দুই দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, হাসপাতালে মূলত স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু তেমন উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।

কেন হঠাৎ বাড়ছে ডায়রিয়া?

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ আরিফুল ইসলাম বলেন, ঋতু পরিবর্তনের সময় আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়তে পারে। অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডার পাশাপাশি অপরিষ্কার পরিবেশও এ ধরনের রোগের বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি বলেন, খোলা, পচা বা বাসি খাবার খাওয়া এবং জীবাণুযুক্ত পানি পান করলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে ডায়রিয়া হতে পারে। এ ছাড়া রোটাভাইরাসের মতো ভাইরাসও এ সময় দ্রুত ছড়াতে পারে। শিশুদের মধ্যে রোটাভাইরাস ডায়রিয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

ডায়রিয়া থেকে সুরক্ষিত থাকতে বিশুদ্ধ বা ফুটানো পানি পান, নিরাপদ খাবার গ্রহণ এবং টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

‘আতঙ্কের কিছু নেই’, বলছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ

নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মাহাবুবুর বলেন, আবহাওয়া পরিবর্তনসহ বেশ কয়েকটি কারণে ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়তে পারে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের দ্রুত স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ে ভয় বা আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ইতোমধ্যে অনেক রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, রোগীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় চাপ তৈরি হলেও চিকিৎসাসেবা চালু রয়েছে এবং আক্রান্তদের প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

পর্যাপ্ত আইভি স্যালাইন আছে, কিছু ওষুধে ঘাটতি

নাটোরের সিভিল সার্জন মশিউর রহমান বলেন, জেলায় হঠাৎ ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়লেও পরিস্থিতি স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তিনি জানান, হাসপাতালে পর্যাপ্ত আইভি স্যালাইন মজুত আছে। তবে অন্যান্য কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে সামান্য ঘাটতি রয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সতর্ক থাকার পরামর্শ

চিকিৎসকদের মতে, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। ফলে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি দ্রুত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। তাই পাতলা পায়খানা শুরু হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার স্যালাইনসহ তরল গ্রহণের দিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

এদিকে নাটোরে ডায়রিয়ার রোগী হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হলেও স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপদ পানি ও খাবার গ্রহণ, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং হাত ধোয়ার অভ্যাস নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

হাসপাতালে রোগীর চাপ কমাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যাপ্ত জনবল দেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনরা।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!