র্ষার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন শত শত মানুষ। একই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা বহুল ব্যবহৃত মশানাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। ফলে প্রচলিত কীটনাশক ব্যবহার করেও মশার বিস্তার কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রোববার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৩৯ জন। একদিনে আক্রান্তের এই সংখ্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ২৮৭ জন, ময়মনসিংহে ৭৯, চট্টগ্রামে ১০০, খুলনায় ১৫৯, রাজশাহীতে ৭১, রংপুরে ২৩, বরিশালে ১১৭ এবং সিলেটে ৩ জন রয়েছেন।
চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৮ হাজার ৯২৯ জন। এর মধ্যে ২৬ হাজার ৮৯৬ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১ হাজার ৯৫১ জন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৮২ জন।
মশানাশকেও কাজ হচ্ছে না
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এডিস মশার কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে ওঠা। রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে বহুল ব্যবহৃত তিন শ্রেণির ছয়টি মশানাশক পরীক্ষা করে পাঁচটির বিরুদ্ধেই এডিস মশার প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকেরা।
গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো কোনো মশানাশকের মাত্রা স্বাভাবিক ব্যবহারের তুলনায় ১০ গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর পরও ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত এডিস মশা বেঁচে ছিল। অর্থাৎ প্রচলিত মাত্রায় এসব কীটনাশক ব্যবহার করে মশা নিধনের কার্যকারিতা অনেকটাই কমে গেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে জাপানের ইনস্টিটিউট অব হেলথ সিকিউরিটির গবেষকদের সহযোগিতায় পরিচালিত গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকেরা এডিস মশার শরীরে কীটনাশক প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত দুটি জিনগত পরিবর্তনও শনাক্ত করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহার, অপরিকল্পিত প্রয়োগ এবং মশার জেনেটিক পরিবর্তনের ফলে এডিস মশার মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে পারে। ফলে শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে সমন্বিত মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
রোগী শনাক্ত হলেই প্রজননস্থল ধ্বংসের উদ্যোগ
ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়ার পর তাঁর বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় গিয়ে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ডেঙ্গু রোগী বেশি ভর্তি হন—এমন হাসপাতাল থেকে নিয়মিত রোগীদের তথ্য সংগ্রহ করবেন সিটি করপোরেশনের কর্মীরা। পরে সেই তথ্যের ভিত্তিতে রোগীর বাসাবাড়ি ও আশপাশে অভিযান চালিয়ে মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করার কথা।
তবে উদ্যোগটি শুরু হওয়ার পরই সমন্বয় ও নজরদারির ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর দুটি হাসপাতালে গিয়ে নির্ধারিত তথ্য সংগ্রহকারীদের পাওয়া যায়নি। এমনকি কোনো কোনো হাসপাতালের কর্মীরা জানিয়েছেন, কয়েক দিন ধরে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কাউকে তারা দেখেননি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রোগী শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত তার আশপাশের এলাকায় মশার লার্ভা ও প্রজননস্থল খুঁজে ধ্বংস করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তথ্য সংগ্রহ ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে সমন্বয় না থাকলে এ উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
দুই সপ্তাহে রোগী বাড়ার তথ্য
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান—আইইডিসিআর জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা বাড়ছে। চিকিৎসকেরাও হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ার কথা জানিয়েছেন।
চিকিৎসকদের জন্য আরও একটি বড় উদ্বেগ হলো ডেঙ্গুর বিভিন্ন সেরোটাইপের সংক্রমণ। আগে একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর পরবর্তী সময়ে অন্য সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে গুরুতর ডেঙ্গু ও মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। ফলে একবার ডেঙ্গু হয়েছিল বলে পরবর্তী সংক্রমণকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।
জ্বর কমলেই বিপদ কাটে না
ডেঙ্গু নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা হলো—জ্বর কমে গেলে রোগী সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসকেরা বলছেন, বাস্তবে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার সময়টিই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায় হতে পারে।
সাধারণত কয়েক দিন জ্বর থাকার পর তা কমতে শুরু করে। এ সময় কিছু রোগীর রক্তনালি থেকে তরল বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এতে রক্তচাপ কমে শক, শ্বাসকষ্ট, পেটে পানি জমা, রক্তক্ষরণসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় একাধিক অঙ্গের কার্যকারিতাও ব্যাহত হতে পারে।
তাই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর জ্বর কমে গেলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়া বা প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ বন্ধ করা ঠিক নয়। সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি।
উত্তরাঞ্চলেও বাড়ছে ডেঙ্গুর ঝুঁকি
ডেঙ্গুর বিস্তার এখন আর শুধু রাজধানী বা বড় শহরকেন্দ্রিক নেই। উত্তরাঞ্চলেও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে রাজশাহী নগরীতে এডিস মশার প্রজনন ঘনত্বও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ কীটতাত্ত্বিক জরিপে রাজশাহী নগরীর পাঁচটি এলাকায় এডিস মশার প্রজনন ঘনত্বের সূচক পাওয়া গেছে ৬১ দশমিক ৩৩। গত মে মাসে একই এলাকায় এ সূচক ছিল ৩০ দশমিক ৬৬। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে এডিস মশার প্রজনন ঘনত্ব প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
গত ৩ থেকে ১০ আগস্ট রাজশাহী নগরীর কাজিহাটা, চণ্ডিপুর, উপরভদ্রা, নামোভদ্রা ও হাজরাপুকুর এলাকায় জরিপটি পরিচালিত হয়। এ সময় ৭৫টি বাড়ি পরিদর্শন করে ২৪টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। পাশাপাশি ৬৮টি পানি ধারণকারী পাত্র পরীক্ষা করে ৪৬টিতেই এডিসের লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
যেসব স্থানে মিলছে এডিসের লার্ভা
জরিপে বিভিন্ন প্রজননস্থল থেকে মোট ৬৮৫টি মশার লার্ভা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ৫০৫টি ছিল এডিস অ্যালবোপিকটাস এবং ৮৬টি এডিস ইজিপ্টি। বাকি ৯৪টি ছিল অন্যান্য প্রজাতির মশার লার্ভা।
ফুলদানি, প্লাস্টিক ও সিরামিকের টব, মাটি ও টিনের পাত্র, নারকেলের খোসা, সিমেন্টের টব, ড্রাম, জলমগ্ন মেঝে, রঙের বালতি ও প্লাস্টিকের বালতিসহ বিভিন্ন ছোট-বড় পানি জমার পাত্রে এসব লার্ভার সন্ধান পাওয়া গেছে।
এ চিত্র বলছে, এডিস মশার প্রজননের জন্য বড় কোনো জলাশয় প্রয়োজন হয় না। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র কিংবা সামান্য পানি জমে থাকা যেকোনো জায়গাই এডিসের প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে।
সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া নিয়ন্ত্রণ কঠিন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশানাশক ছিটানো বা হাসপাতালে রোগী চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেই হবে না। একই সঙ্গে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত কীটতাত্ত্বিক জরিপ, কার্যকর কীটনাশক নির্বাচন, রোগী শনাক্তকরণ এবং আক্রান্ত এলাকার দ্রুত নজরদারি—সবগুলো কার্যক্রম একসঙ্গে চালাতে হবে।
বিশেষ করে যে কীটনাশকের বিরুদ্ধে এডিস মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে, সেগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিকল্প কীটনাশক ও সমন্বিত মশক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি নগরবাসীকেও নিজেদের বাসাবাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়ার বিষয়ে আরও সতর্ক হতে হবে।
ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি তাই কেবল স্বাস্থ্য খাতের সংকট নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনা, জনসচেতনতা, পরিবেশ ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সমন্বিত সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা। এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে বর্ষা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

