ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬, ০৪:৫২ পিএম

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

ছবিঃ সংগৃহীত

ডেঙ্গুর সংক্রমণ প্রতিরোধে শুধু সরকারি সংস্থার ওপর নির্ভর না করে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে সারাদেশে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে ডেঙ্গু মোকাবিলায় সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের সুফল সাধারণ মানুষ বাস্তবে পাচ্ছে কি না, তা নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। শুধু মশক নিধন বা চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে ডেঙ্গুর প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং জনগণকে সচেতন করার মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও প্রতিকারমূলক করণীয় নিয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় এসব নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি

সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় কেবল সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এ রোগের বিস্তার ঠেকাতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নিজ নিজ বাড়িঘর, আঙিনা ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি কোথাও পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার নির্দেশ দেন তিনি।

বিশেষ করে ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, ড্রেন কিংবা অন্য কোনো স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

স্বেচ্ছাসেবকদের কাজে লাগানোর নির্দেশ

পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও জনসচেতনতা কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করতে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠনের সদস্যদের সম্পৃক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার স্বেচ্ছাসেবক দলের পাশাপাশি বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), রোভার স্কাউট এবং রেড ক্রিসেন্টের সদস্যদের ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমে যুক্ত করার বিষয়ে সভায় নির্দেশনা দেওয়া হয়।

স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে তাঁদের অংশগ্রহণে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার পরামর্শও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

এর ফলে শুধু সিটি করপোরেশন বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল না থেকে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও অন্যান্য স্থানীয় পর্যায়ে জনগণকে সম্পৃক্ত করে ধারাবাহিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।

‘সিদ্ধান্তের প্রতিফলন থাকতে হবে মাঠে’

ডেঙ্গু মোকাবিলায় সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সেটি বাস্তবায়ন না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গৃহীত প্রতিটি উদ্যোগের সুস্পষ্ট প্রতিফলন মাঠপর্যায়ে থাকতে হবে।

সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। বিশেষ করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে চিকিৎসার পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

উপজেলা হাসপাতালেও বাড়বে ডেঙ্গু চিকিৎসা সক্ষমতা

সভায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় ও সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাসুবিধা নিশ্চিত করা এবং রোগী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর মাধ্যমে জেলা শহর বা বড় হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়েই ডেঙ্গু রোগীদের প্রাথমিক ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্তকরণ, পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার বিষয়েও সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ডেঙ্গু রোগীদের মশারি দেওয়ার ওপর গুরুত্ব

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পর্যাপ্ত মশারি সরবরাহের বিষয়টিও সভায় গুরুত্ব পেয়েছে।

কারণ ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে এডিস মশা কামড়ানোর পর সেই মশা অন্য সুস্থ মানুষকে কামড়ালে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মশারি ব্যবহারের মাধ্যমে সংক্রমণের সম্ভাব্য চক্র ভেঙে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত মশারি সরবরাহ এবং রোগীদের তা ব্যবহারে উৎসাহিত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধে জোর

প্রধানমন্ত্রী ডেঙ্গু মোকাবিলায় চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

সভায় বলা হয়, আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে পারলে সংক্রমণের বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এজন্য মশক নিধন কার্যক্রম, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং জনসচেতনতা—সব কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালনা করতে হবে।

স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

নিয়মিত তদারকির ওপর গুরুত্ব

ডেঙ্গু প্রতিরোধে গৃহীত পদক্ষেপের বাস্তব ফলাফল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কোনো এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে দ্রুত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম কতটা কার্যকর হচ্ছে, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা হচ্ছে কি না এবং জনগণ সচেতন হচ্ছে কি না—এসব বিষয় নিয়মিত তদারকির আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সভায় যারা উপস্থিত ছিলেন

ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও প্রতিকারমূলক করণীয় নিয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খানসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি, সংক্রমণ প্রতিরোধে গৃহীত পদক্ষেপ, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, জনসচেতনতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যক্রম আরও জোরদারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের মূল পরিকল্পনা কী?

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা শক্তিশালী করা।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের করণীয় কী?

নিজের বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, কোথাও পানি জমতে না দেওয়া, নিয়মিত জমে থাকা পানি অপসারণ, আবর্জনা পরিষ্কার করা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা—ডেঙ্গু প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

সরকারের পাশাপাশি নাগরিকদের সম্মিলিত অংশগ্রহণেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!