যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্যিক শুল্ক নীতিতে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা অর্জন করেছে। বিশ্বের ৮৬টি দেশের জন্য ঘোষিত নতুন শুল্ক কাঠামোয় বাংলাদেশকে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের আওতায় রাখা হয়েছে। এতে চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর তুলনায় মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার (২৪ জুলাই) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড অ্যাক্ট-১৯৭৪-এর ৩০১ ধারার আওতায় পরিচালিত তদন্ত শেষে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর) বিশ্বের ৮৬টি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী ৬০টি অর্থনীতির জন্য নতুন শুল্কহার ঘোষণা করেছে।
২৩ জুলাই থেকে কার্যকর নতুন শুল্ক ব্যবস্থা
ইউএসটিআরের ঘোষণায় বলা হয়েছে, ২৩ জুলাই ঘোষিত নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওয়াশিংটন সময় রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হয়েছে।
এর মাধ্যমে ট্রেড অ্যাক্টের ১২২ ধারার আওতায় আগে কার্যকর থাকা অস্থায়ী ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন শুল্ক কাঠামো চালু হলো।
নতুন নীতির আওতায় বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া পণ্যের ওপর বিদ্যমান মোস্ট ফেভার্ড নেশন (MFN) শুল্কের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
৮৬ দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন শুল্ক পাওয়া ১৭ দেশের একটি বাংলাদেশ
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ৮৬টি দেশের মধ্যে মাত্র ১৭টি দেশ সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের সুবিধা পেয়েছে। বাংলাদেশও সেই তালিকায় রয়েছে।
সরকারের মতে, এই অবস্থান বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় এগিয়ে বাংলাদেশ
বিশ্বের অন্যতম প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের জন্য অতিরিক্ত শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।
অর্থাৎ, এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ২ দশমিক ৫ শতাংশ কম অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ হবে। ফলে মার্কিন আমদানিকারকদের কাছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও অন্যান্য পণ্য তুলনামূলকভাবে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বাণিজ্য বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে অল্প শুল্ক পার্থক্যও বড় ধরনের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করতে পারে। এতে নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান বাজারও আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে ট্যারিফ-রেট কোটা
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, ইউএসটিআর বর্তমানে বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার জন্য তিন বছর মেয়াদি ট্যারিফ-রেট কোটা (TRQ) চালুর বিষয়টি বিবেচনা করছে।
এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও বস্ত্র উপকরণ ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে ৩০১ ধারার অতিরিক্ত শুল্ক সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে মওকুফ করা হতে পারে।
এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা আরও বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামাল ব্যবহার বৃদ্ধি এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
রপ্তানি খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস তৈরি পোশাক শিল্প। প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন শুল্ক কাঠামোতে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে কম শুল্ক পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দেশের পোশাক, টেক্সটাইল ও অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের চাহিদা আরও বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক শ্রমমান বজায় রাখার অঙ্গীকার
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক শ্রমমান অনুসরণ, শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা এবং দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের টেকসই উন্নয়ন ও নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চালিয়ে যাবে।
মন্ত্রণালয়ের মতে, শ্রম অধিকার, উৎপাদন মান ও টেকসই শিল্প ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার আরও সম্প্রসারিত হবে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব
অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তুলনামূলক কম অতিরিক্ত শুল্ক বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প নতুন ক্রয়াদেশ পেলে উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগও বাড়বে।
তবে তারা মনে করেন, এই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে শ্রমমান উন্নয়ন, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

