ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত শিল্প খাত: অর্ধেকে নেমেছে উৎপাদন, রপ্তানি ও অর্থনীতিতে বাড়ছে শঙ্কা

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: জুলাই ২৭, ২০২৬, ০৯:৫৮ এএম

গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত শিল্প খাত: অর্ধেকে নেমেছে উৎপাদন, রপ্তানি ও অর্থনীতিতে বাড়ছে শঙ্কা

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের শিল্প খাত বর্তমানে তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্প উৎপাদনে। গ্যাসনির্ভর অসংখ্য কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে, অনেক কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান সীমিত সময় উৎপাদন চালাতে বাধ্য হচ্ছে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি, কর্মসংস্থান, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ, রাজস্ব আদায় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাদের দাবি, বর্তমানে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শিল্প-কারখানা আংশিক বা সম্পূর্ণ উৎপাদন সংকটে রয়েছে।

চাহিদার তুলনায় বিশাল গ্যাস ঘাটতি

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। এর ফলে শিল্প, বিদ্যুৎ, আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সিএনজি—সব খাতেই গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, বিদেশি প্রকৌশলীরা টার্মিনাল মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে কবে নাগাদ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত সময় জানানো সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে।

শিল্পাঞ্চলে উৎপাদনে ধস

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর শিল্পাঞ্চল।

গাজীপুরের কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, টঙ্গী, শ্রীপুর, মৌচাক, চন্দ্রা ও বোর্ডবাজার এলাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অনেক কারখানায় যেখানে ১০ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই। ফলে বয়লার, জেনারেটর ও উৎপাদন যন্ত্রপাতি সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

সাভার ও আশুলিয়ার প্রায় ১ হাজার ২০০ শিল্প-কারখানাও একই সংকটে পড়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, সময়মতো বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

নরসিংদীর ডাইং, নিটিং ও ফিনিশিং শিল্পেও একই চিত্র। অনেক কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে পোশাক শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পুরো রপ্তানি খাতেই প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

রপ্তানি ও বিনিয়োগে বাড়ছে ঝুঁকি

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্টিল, সিরামিক, কাগজ, স্পিনিং ও ডাইং শিল্পের অধিকাংশই গ্যাসনির্ভর।

শিল্পমালিকদের মতে, নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শেষ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হবে। এতে ক্রয়াদেশ বাতিল, আর্থিক জরিমানা, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়া এবং নতুন অর্ডার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প হিসেবে ডিজেল ও এলপিজি ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও কমছে।

শিল্পমালিকদের উদ্বেগ

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, দেশের পোশাক ও টেক্সটাইল খাত বর্তমানে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি অর্থায়ন ও নিরাপত্তা সংকটেও রয়েছে।

তিনি বলেন, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ রেখেও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করছে। এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে কার্যকর মূলধন শেষ হয়ে যাবে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারবে না। একই সঙ্গে সরকারের কর ও ভ্যাট আদায়ও কমে যাবে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বর্তমান সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি; এটি দীর্ঘদিনের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতার ফল।

তার মতে, সরকারকে শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবসম্মত জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কর-সুবিধা, আর্থিক প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

স্টিল ও সিরামিক শিল্পেও একই অবস্থা

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ বলেন, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে অনেক স্টিল মিল কার্যত উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মইনুল ইসলাম বলেন, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি সংকটপূর্ণ। এই অবস্থা দীর্ঘ হলে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও রপ্তানিতে আরও বড় ধাক্কা লাগবে।

তিতাসের সতর্কবার্তা

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগে যেখানে শিল্পাঞ্চলে ৭০ থেকে ৮০ পিএসআই গ্যাসচাপ পাওয়া যেত, এখন অনেক এলাকায় তা নেমে এসেছে ২০ থেকে ২৫ পিএসআইয়ে। কিছু এলাকায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।

কেন বারবার সংকট?

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল কারণ শুধু একটি এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি নয়; বরং দেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা।

গত কয়েক বছরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে। সেই ঘাটতি পূরণে এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের যেকোনো একটিতে সমস্যা দেখা দিলেই পুরো জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা চাপে পড়ে যাচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, দেশের গ্যাস ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত বিকল্প সক্ষমতা না থাকায় একটি টার্মিনাল বন্ধ হলেই শিল্পসহ পুরো অর্থনীতি সংকটে পড়ে।

অন্যদিকে ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়াই বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

সরকারের পরিকল্পনা

জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরকার ১০০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। পাশাপাশি মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং অতিরিক্ত এফএসআরইউ স্থাপনের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, শিল্প উদ্যোক্তারা উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পাচ্ছেন না। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে এবং নতুন বিনিয়োগও নিরুৎসাহিত হচ্ছে।

তার মতে, শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন বৃদ্ধি, সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন, অপচয় রোধ, অবৈধ সংযোগ নিয়ন্ত্রণ এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্প খাত দেশের প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি। তাই গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!