করোনা মহামারির ধাক্কা, দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পাবলিক পরীক্ষা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অটোপাস এবং পাঠ্যবই বিতরণে বিলম্ব—সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নজিরবিহীন শিখন সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা ৭ জানুয়ারি এবং এইচএসসি পরীক্ষা ৬ জুন থেকে নেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—শিক্ষার্থীরা কি আদৌ সেই প্রস্তুতি অর্জন করতে পারবে, নাকি শিখন ঘাটতি আরও গভীর হবে?
শিক্ষাবিদ, শিক্ষা গবেষক, অভিভাবক এবং শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনার উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও তার আগে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের লার্নিং ডেফিসিট বা শিখন ঘাটতি পূরণে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি। অন্যথায় কেবল পরীক্ষার সময় পরিবর্তন করে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার মান অর্জন সম্ভব হবে না।
চার বছরে একের পর এক ধাক্কা
২০২০ সালের ১৭ মার্চ করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দেশের কয়েক কোটি শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক শেখার ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের। কারণ এই সময়েই তাদের মৌলিক ভাষা, গণিত ও বিশ্লেষণী দক্ষতা গড়ে ওঠার কথা ছিল।
করোনাকালে ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে ফল প্রকাশ করা হয়। পরে ২০২১ ও ২০২২ সালে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পরীক্ষা সম্পন্ন হলেও শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি পূরণ হয়নি।
রাজনৈতিক অস্থিরতায় নতুন সংকট
করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে যখন অতিরিক্ত ক্লাস ও রেমিডিয়াল শিক্ষার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছিল, তখন ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতায় আবারও শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান সম্ভব হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে অটোপাস দেওয়া হয়। শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক চাপ কমালেও দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
২০২৫ সালজুড়েও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি ফিরে আসেনি। বছরের শুরুতে সময়মতো পাঠ্যবই না পৌঁছানো, নির্বাচনজনিত ছুটি এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার কারণে নির্ধারিত সময়ের সিলেবাসও শেষ করা সম্ভব হয়নি।
শেখার ঘাটতি কতটা গভীর?
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সংকট শুধু পরীক্ষার ফলাফলের নয়; এটি শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা অর্জনের সংকট।
অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণি অনুযায়ী পাঠ বুঝতে পারছে না। বিশেষ করে গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজিতে দক্ষতার ঘাটতি প্রকট হয়েছে। একই সঙ্গে পড়ার অভ্যাস, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাসেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, মাঠপর্যায়ে গিয়ে তিনি দেখেছেন চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থীর জন্য পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু বোঝাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তার আশঙ্কা, সরকারি হিসাবের তুলনায় বাস্তবে শিখনে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বেশি।
পরীক্ষা এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ঘোষণা দিয়েছেন, ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা ৭ জানুয়ারি এবং এইচএসসি পরীক্ষা ৬ জুন শুরু হবে।
সরকারের যুক্তি, শিক্ষা বর্ষকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় প্রবেশে সময়ের অপচয় কমানো।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়সূচি পরিবর্তনের আগে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি পূরণে বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
কোচিংনির্ভর শিক্ষা আরও বাড়ছে
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরীর মতে, বিদ্যালয়ে কার্যকরভাবে পাঠদান না হওয়ায় অভিভাবকেরা বাধ্য হয়ে সন্তানদের কোচিং সেন্টারে পাঠাচ্ছেন।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছায় কোচিংয়ে যায় না; বরং স্কুলে পাঠ সম্পূর্ণ না হওয়ায় তারা বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হয়।
তার মতে, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং শ্রেণিকক্ষেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
‘তাড়াহুড়ো নয়, শেখা নিশ্চিত করতে হবে’
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ মনে করেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে যান্ত্রিকভাবে পরিচালনা করা উচিত নয়।
তার মতে, শিক্ষার্থীদের যথাযথ শেখার সুযোগ নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে পরীক্ষার কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। পাঁচটি মূল বিষয়ে মূল্যায়ন করেও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা যাচাই সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষাবর্ষ জানুয়ারি নয়, জুলাই-আগস্ট থেকে শুরু করার বিষয়টিও নতুন করে ভাবা উচিত।
গবেষকদের সুপারিশ
শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক মনে করেন, শিখন ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ প্রয়োজন—
রেমিডিয়াল ও এক্সিলারেটেড লার্নিং কর্মসূচি পুনরায় চালু করা।
প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা অতিরিক্ত ক্লাস।
প্রয়োজন হলে সাপ্তাহিক ছুটি পুনর্বিন্যাস।
বিদ্যালয়ে কন্টাক্ট আওয়ার বৃদ্ধি।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মনিটরিং।
বিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।
সামাজিক প্রভাবও উদ্বেগজনক
রাশেদা কে চৌধুরীর মতে, দীর্ঘদিনের শিক্ষা বিঘ্ন শুধু শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্ষতিই করেনি; সামাজিক আচরণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তিনি বলেন, শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা, মব সংস্কৃতি, কিশোর গ্যাং এবং নৈতিক অবক্ষয়ের পেছনেও দীর্ঘ শিক্ষা সংকটের প্রভাব রয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শিখন ঘাটতি কমাতে ইতোমধ্যে কয়েকটি সমন্বিত কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
পাঠ্যক্রম পুনর্বিন্যাস
শিক্ষক প্রশিক্ষণ
প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান
নিয়মিত তদারকি
রেমিডিয়াল শিক্ষা চালু
শিক্ষার মান মূল্যায়নের নতুন কাঠামো
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত চার বছরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু পাঠদানে নয়, শিক্ষার গুণগত মান, মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ—সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
তাদের মতে, নতুন পরীক্ষা সূচি বাস্তবায়নের আগে শিখন ঘাটতি নিরূপণে জাতীয় পর্যায়ে একটি Learning Assessment Survey পরিচালনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পুনর্বাসনমূলক শিক্ষা কর্মসূচি ছাড়া কেবল পরীক্ষার সময় পরিবর্তন করলে সংকট আরও প্রকট হতে পারে।
শিক্ষাবিদদের ভাষায়, "পরীক্ষা এগিয়ে নেওয়া সহজ, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া শেখা ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন।" তাই নতুন সময়সূচির পাশাপাশি শিক্ষা পুনরুদ্ধারে বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

