ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

ডলারের বাজারে ফের অস্থিরতা: আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি কমায় বাড়ছে চাপ, নতুন চ্যালেঞ্জে অর্থনীতি

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: আগস্ট ৩, ২০২৬, ০৯:৩৬ এএম

ডলারের বাজারে ফের অস্থিরতা: আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি কমায় বাড়ছে চাপ, নতুন চ্যালেঞ্জে অর্থনীতি

ছবিঃ সংগৃহীত

আমদানি বিল পরিশোধে মার্কিন ডলারের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আবারও চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তঃব্যাংক বাজার থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং খোলা বাজার—সবখানেই ডলারের দাম ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি আয়ে শ্লথ গতি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা কমে যাওয়ার ফলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে নতুন করে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুলাই আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সর্বোচ্চ পর্যায়। একই দিনে স্পট মার্কেটে ডলার বিক্রি হয়েছে ১২৩ টাকা ৮৮ পয়সায়। অথচ মাত্র এক মাস আগেও এ হার ছিল প্রায় ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা।

তবে বাস্তব পরিস্থিতি আরও কঠিন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা এবং ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তির জন্য অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংককে ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সা পর্যন্ত দামে ডলার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ফলে আমদানিকারকদের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।

কেন বাড়ছে ডলারের চাহিদা?

ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ—উভয় কারণেই ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এর ফলে বাংলাদেশকে বেশি দামে জ্বালানি, এলএনজি, সার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। এসব আমদানি বিল পরিশোধে বিপুল পরিমাণ ডলারের প্রয়োজন হওয়ায় বাজারে চাহিদা বেড়েছে।

অন্যদিকে দেশের আমদানি প্রবৃদ্ধি রপ্তানির তুলনায় অনেক দ্রুত বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে দেশের মোট আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬.২৬ শতাংশ বেশি।

অপরদিকে একই সময়ে রপ্তানি আয় প্রায় ২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ বিলিয়ন ডলারে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রবেশের তুলনায় বের হয়ে যাওয়ার পরিমাণ অনেক বেশি হওয়ায় ডলারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

রেমিট্যান্সেও গতি কমেছে

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস রেমিট্যান্স।

গত অর্থবছরে প্রবাসীরা রেকর্ড ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠালেও ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার পর রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছুটা ধীরগতি দেখা দিয়েছে।

টানা ছয় মাস প্রতি মাসে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এলেও জুনে তা নেমে আসে ২৮২ কোটি ডলারে এবং জুলাইয়ে ২৮৬ কোটি ডলারে।

বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়াও ডলারের সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নির্দেশনা

ডলারের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে মৌখিকভাবে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, আন্তঃব্যাংক বাজার কিংবা রেমিট্যান্স চ্যানেল—কোনো ক্ষেত্রেই ১২৩ টাকা ৮২ পয়সার বেশি দামে ডলার কেনা যাবে না। এর মাধ্যমে বাজারে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

খোলা বাজারেও বাড়ছে ডলারের দাম

ব্যাংকিং খাতে ডলারের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে খোলা বাজার বা কার্ব মার্কেটেও।

রাজধানীর মতিঝিলের বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জ ঘুরে দেখা গেছে, রোববার সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রতি ডলার ১২৬.০০ থেকে ১২৬.৪০ টাকা দরে কেনা হয়েছে এবং বিক্রি করা হয়েছে ১২৬.৭০ থেকে ১২৬.৮০ টাকা দরে।

এক মাস আগেও যেখানে ডলারের দাম ছিল ১২৫ থেকে ১২৫.২০ টাকার মধ্যে, সেখানে অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রায় দেড় টাকা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে।

অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?

অর্থনীতিবিদদের মতে, ডলারের দাম দীর্ঘ সময় ধরে ঊর্ধ্বমুখী থাকলে আমদানি ব্যয় আরও বাড়বে। এর ফলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত চাপ এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।

তাদের মতে, ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও উৎসাহিত করা, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!