দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার পর বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলতে শুরু করেছে। নতুন সরকারের ধারাবাহিক নীতিগত সংস্কার, ব্যবসা সহজীকরণের উদ্যোগ, শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে গৃহীত বহুমুখী পদক্ষেপ দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন আস্থার সঞ্চার করছে।
বিশেষ করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ কর্তৃপক্ষ গঠন, ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল সেবা, লাইসেন্স ও কোম্পানি নিবন্ধনের সময়সীমা কমানো, নতুন শিল্পনগরী ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবনে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল এবং ৬০ হাজার কোটি টাকার স্টিমুলাস প্যাকেজ—এসব উদ্যোগকে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।
তাদের মতে, দীর্ঘদিন পর সরকার বিনিয়োগকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তবে এই ইতিবাচক ধারার স্থায়িত্ব নির্ভর করবে ঘোষিত নীতিগুলোর দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
বন্ধ হচ্ছে কারখানা, আবার গড়েও উঠছে নতুন শিল্প
দেশের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাত বর্তমানে পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ছয় মাসে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। একই সময়ে অন্তত ৫০টি প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে।
তবে এই নেতিবাচক চিত্রের বিপরীতে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৭০টি নতুন শিল্পকারখানা চালু হয়েছে বা উৎপাদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগের ধরনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। সাধারণ পোশাক উৎপাদনের পরিবর্তে এখন ম্যান-মেইড ফাইবার, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প, উচ্চমূল্যের অ্যাকসেসরিজ, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং আমদানি বিকল্প শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ছে।
ইতোমধ্যে এনভয় গ্রুপ নতুন সুতা ও কৃত্রিম তন্তুর কারখানা স্থাপন করছে। হা-মীম গ্রুপ চীনা অংশীদারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে আধুনিক অ্যাকসেসরিজ কারখানা চালু করেছে। ডিবিএল গ্রুপও উচ্চমূল্যের পোশাক উপকরণ ও অন্তর্বাস উৎপাদনে নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল নতুন কারখানা স্থাপনের বিষয় নয়; বরং দেশের শিল্পখাত প্রযুক্তিনির্ভর ও উচ্চমূল্য সংযোজনমুখী উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
সরকারের নতুন নীতিতে বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের আস্থা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করেছে। পাশাপাশি স্থানীয় সুতা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নগদ সহায়তা ১.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। বিভিন্ন শিল্প খাতে কর ছাড় ও বিনিয়োগ প্রণোদনাও ঘোষণা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, অর্থনীতিতে পুরোনো প্রতিষ্ঠানের জায়গায় নতুন প্রতিষ্ঠান আসা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে গত দুই বছরের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে সরকারের নতুন নীতিগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার বলেন, সরকারের সদিচ্ছা স্পষ্ট হলেও বাস্তবায়নের গতি ও দক্ষতাই বিনিয়োগকারীদের আস্থা নির্ধারণ করবে।
‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ আইন: এক ছাতার নিচে সব বিনিয়োগসেবা
বিনিয়োগ সহজ করতে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ আইন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ (পিপিপি) এবং সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা হচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী—
ত্রুটিমুক্ত আবেদন জমা দেওয়ার ৭ দিনের মধ্যে লাইসেন্স প্রদান।
৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোম্পানি নিবন্ধন।
নির্ধারিত সময়ে কোনো সিদ্ধান্ত না এলে আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হবে।
সম্পূর্ণ ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস ও সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা চালু হবে।
বিদেশি দক্ষ কর্মীদের ৭ দিনের মধ্যে ওয়ার্ক পারমিট এবং ১০ দিনের মধ্যে ভিসা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রশাসনিক বিলম্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে বাড়বে আস্থা
আইসিবির চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, একাধিক বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ থাকায় বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বিভ্রান্তি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।
তিনি বলেন, বিডা, বেজা ও পিপিপিকে একীভূত করে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ গঠন বিনিয়োগ পরিবেশে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। এতে অনুমোদন, লাইসেন্স ও অন্যান্য প্রশাসনিক সেবা একই প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে, যা বিনিয়োগকারীদের সময় ও ব্যয় কমাবে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কেবল নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন নয়—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষ বাস্তবায়নই হবে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
নতুন শিল্পনগরী ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
সরকার পটুয়াখালী ও যশোরে নতুন শিল্পনগরী গড়ে তুলছে, যেখানে প্রায় আড়াই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, চাঁদপুর ও কুষ্টিয়ায় নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে।
একই সঙ্গে ১৯টি সম্ভাবনাময় খাতের জন্য পৃথক বিনিয়োগ রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে সরকার।
৬০ হাজার কোটি টাকার স্টিমুলাস প্যাকেজ
বেসরকারি বিনিয়োগকে গতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার স্টিমুলাস প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।
এ প্যাকেজের আওতায় বড় শিল্প, সেবা খাত, কৃষি, সিএমএসএমই, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং উত্তরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক শিল্প সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পাবে। সরকার ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকিও দেবে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
বিদেশি বিনিয়োগেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাডের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রায় ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির মধ্যে অন্যতম।
বিশ্লেষকদের মতে, এ প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে বিদ্যমান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পুনর্বিনিয়োগ থেকে। তবে নতুন গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত ধারাবাহিকতা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ আরও শক্তিশালী করতে হবে।
চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে
ইতিবাচক অগ্রগতির পাশাপাশি কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণ, খেলাপি ঋণ, আর্থিক খাতের সুশাসন, ডলারের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক সেবার গতি—এসব বিষয় এখনো বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের জায়গা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগকারীরা শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়; বরং বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা ও আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।
আশার বার্তা, তবে বাস্তবায়নই মূল চাবিকাঠি
সামগ্রিকভাবে শিল্প সম্প্রসারণ, নতুন কারখানা, ডিজিটাল সেবা, কর সুবিধা, অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের ধারাবাহিক পদক্ষেপ বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘোষিত সংস্কারগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী কয়েক বছরে দেশীয় ও বিদেশি—উভয় ধরনের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর আরও ত্বরান্বিত হবে।

