ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

গ্যাস সংকটে শিল্পে ধসের আশঙ্কা: উৎপাদন কমছে, রপ্তানি ঝুঁকিতে, চাপে পুরো অর্থনীতি

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: আগস্ট ৪, ২০২৬, ০২:৩৩ পিএম

গ্যাস সংকটে শিল্পে ধসের আশঙ্কা: উৎপাদন কমছে, রপ্তানি ঝুঁকিতে, চাপে পুরো অর্থনীতি

ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশের শিল্প খাত বর্তমানে এক গভীর জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির পর সৃষ্ট গ্যাস সংকট এখন শুধু কয়েকটি শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয় নয়; বরং এটি দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা, রপ্তানি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে, নতুন ক্রয়াদেশ গ্রহণ স্থগিত রাখতে কিংবা সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ করতেও বাধ্য হতে পারে। এতে দেশের রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং শিল্প প্রবৃদ্ধি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।

একটি টার্মিনালের ত্রুটিতে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বলতা উন্মোচিত

বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দু মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল। যান্ত্রিক ত্রুটি ও অগ্নিকাণ্ডের কারণে এই টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

জ্বালানি খাতের তথ্য অনুযায়ী, এই টার্মিনাল প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করত। টার্মিনাল বিকল হওয়ার পর জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ থেকে ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট, কিন্তু সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২,৭০০ থেকে ২,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি মাত্র অবকাঠামো অচল হয়ে পুরো দেশের শিল্প উৎপাদন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার ঘটনা জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বলতার স্পষ্ট প্রমাণ।

গ্যাসের চাপ শূন্যের কাছাকাছি, উৎপাদন ব্যাহত শিল্পাঞ্চলে

গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রামসহ দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। অনেক শিল্প উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক কারখানায় চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে।

ফলে বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেলেও উৎপাদন কমে যাওয়ায় আয় হ্রাস পাচ্ছে। অর্থাৎ একই সঙ্গে ব্যয় বাড়ছে এবং আয় কমছে—যা শিল্প খাতকে এক কঠিন আর্থিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কারখানা পুরোপুরি বন্ধ নয়, কিন্তু স্বাভাবিক উৎপাদনও নেই

সম্প্রতি কয়েকটি পোশাক কারখানায় টানা ছুটি ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে "গ্যাস সংকটে কারখানা বন্ধ"—এমন আলোচনা শুরু হয়। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কোনো সদস্য কারখানা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি ছুটি, সাপ্তাহিক ছুটি এবং শ্রমিকদের অনুরোধের কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ছুটি দিয়েছে।

তবে শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস্তবে গ্যাস সংকটের কারণে ডাইং ও ফিনিশিং ইউনিটগুলো পর্যাপ্ত উৎপাদন করতে না পারায় সেলাই কারখানাগুলো প্রয়োজনীয় কাপড় পাচ্ছে না। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমে যাওয়ার সময়কে ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পোশাক ও বস্ত্রশিল্প

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় আঘাত পড়েছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে।

ডাইং ইউনিটে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় কাপড় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে অনেক গার্মেন্টস কারখানার সেলাই লাইন অলস পড়ে আছে।

শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে—

অনেক কারখানা মাত্র ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে।
স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
কিছু কারখানায় দৈনিক উৎপাদন ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
সিরামিক, কাচ, ইস্পাত, ওষুধ শিল্পেও বিপর্যয়

সংকট শুধু তৈরি পোশাক খাতেই সীমাবদ্ধ নয়।

কাচ, সিরামিক, ইস্পাত, প্লাস্টিক, খাদ্য, ওষুধ ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও একই সমস্যায় পড়েছে।

বিশেষ করে সিরামিক ও কাচ শিল্পে দীর্ঘ সময় চুল্লি বন্ধ থাকলে শত শত কোটি টাকার স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইস্পাত শিল্পেও একবার উৎপাদন বন্ধ হলে পুনরায় উৎপাদন শুরু করতে দীর্ঘ সময় ও অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হয়।

ডিজেলনির্ভর উৎপাদনে ব্যয় দ্বিগুণ

গ্যাস না থাকায় অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপাদন চালাচ্ছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।

শিল্পমালিকদের দাবি, অনেক প্রতিষ্ঠানের ইউটিলিটি ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অতিরিক্ত মূল্য দিতে রাজি নন।ফলে পুরো অতিরিক্ত ব্যয় উদ্যোক্তাদের বহন করতে হচ্ছে।

রপ্তানি আদেশ হারানোর শঙ্কা বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন সময়মতো পণ্য সরবরাহ।

গ্যাস সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শেষ করতে পারছে না।

ইতোমধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মূল্যছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে। আবার কিছু বিদেশি ক্রেতা বিকল্প দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের উদ্যোগও নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

শিল্প নেতাদের মতে, একবার কোনো ক্রেতা উৎপাদন অন্য দেশে সরিয়ে নিলে তাকে আবার ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন।

‍‍`এটি শুধু জ্বালানি সংকট নয়‍‍`

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন,

"বর্তমান গ্যাস সংকটকে শুধু একটি জ্বালানি সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য একটি বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।"

তিনি বলেন, স্পিনিং, ডাইং, ফিনিশিং থেকে শুরু করে পুরো পোশাক শিল্পের সরবরাহ শৃঙ্খল গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। একটি অংশ ব্যাহত হলেই পুরো উৎপাদন ব্যবস্থায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

তার মতে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদনে বিলম্ব হলে শুধু একটি চালান নয়, বাংলাদেশের প্রতি ক্রেতাদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

তিনি আরও বলেন, ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো যখন নতুন ক্রয়াদেশ আকর্ষণের চেষ্টা করছে, তখন দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিছুদিন ডিজেল ব্যবহার করে উৎপাদন চালাতে পারলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সেই সক্ষমতা নেই।

উৎপাদন কমলেও শ্রমিকদের বেতন, ব্যাংক ঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, কারখানার ভাড়া এবং অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।

উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান সংকট দীর্ঘ হলে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারবে না।

মূল্যস্ফীতিতেও পড়তে পারে নতুন চাপ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু শিল্পাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

ভোগ্যপণ্য, খাদ্য, প্লাস্টিক, নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন কমে গেলে বাজারে সরবরাহও কমে যাবে। এর ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া সংকট কাটবে না

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটির ফল নয়; এটি দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।

তাদের মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তারা ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট এড়াতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উন্নয়ন, স্থলভিত্তিক এলএনজি অবকাঠামো নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং শিল্পের জন্য বহুমুখী জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি আর শুধু গ্যাস সংকট নয়; এটি উৎপাদন, রপ্তানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং মূল্যস্ফীতিকে একযোগে প্রভাবিত করা একটি জাতীয় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান শক্তি উৎপাদন ও রপ্তানি। সেই ভিত্তি যদি দীর্ঘ সময় জ্বালানি সংকটে দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে এর প্রভাব শুধু শিল্পাঞ্চলেই নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং কর্মসংস্থানেও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের ভাষায়, "এটি আর কেবল গ্যাস সংকট নয়—এটি বাংলাদেশের শিল্প ও অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার লড়াই।"

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!