২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং কাস্টমস শুল্ক—এই তিন প্রধান খাত মিলিয়ে মোট ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ১২.০৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। চূড়ান্ত হিসাবে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা, যা সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) এনবিআরের প্রকাশিত সর্বশেষ রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ এনবিআর
২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তীতে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে বছর শেষে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা, ফলে লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে থাকতে হয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা।
এর আগে গত ১২ জুলাই জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৯২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতির কথা জানিয়েছিলেন। পরে চূড়ান্ত হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ কিছুটা কমে আসে।
প্রবৃদ্ধি থাকলেও লক্ষ্য অধরাই
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায় ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। সেই তুলনায় সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে রাজস্ব আদায় বেড়েছে প্রায় ৪৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যা ১২.০৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও বাজেটের তুলনায় বড় ঘাটতি সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অবকাঠামো বিনিয়োগে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
আয়করে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি
রাজস্বের তিনটি প্রধান উৎসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি এসেছে আয়কর খাত থেকে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয়কর থেকে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এই খাতে আদায় হয়েছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ৯১ কোটি টাকা। ফলে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ১২.৮০ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন আয়কর রিটার্ন, করজাল সম্প্রসারণ এবং উৎসে কর আদায়ের কার্যক্রম জোরদার হওয়ায় আয়কর আদায়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ভ্যাট এখনও রাজস্বের প্রধান উৎস
এনবিআরের সবচেয়ে বড় রাজস্ব উৎস হিসেবে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) খাত থেকে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা।
আগের অর্থবছরে এই খাতে আদায় হয়েছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। ফলে ভ্যাট আদায়ে ১১.৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
তবে ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশের অভিযোগ, ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় জটিলতা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যাশিত হারে রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব হয়নি।
কাস্টমসেও দ্বি-অঙ্কের প্রবৃদ্ধি
আমদানি ও রপ্তানি শুল্কসহ কাস্টমস খাত থেকে আদায় হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ১১৯ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খাতে আদায় হয়েছিল ১ লাখ ৯৮ কোটি টাকা। ফলে কাস্টমস রাজস্বে ১১.৯০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
যদিও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতি কিছুটা বাড়ায় কাস্টমস আদায় বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে আমদানি নিয়ন্ত্রণ নীতি এবং শিল্প কাঁচামাল আমদানির ধীরগতির প্রভাবও রাজস্ব আহরণে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অটোমেশনেও মিলল না প্রত্যাশিত ফল
গত অর্থবছরে করজাল সম্প্রসারণ, অনলাইন সেবা বৃদ্ধি, অটোমেশন, ই-রিটার্ন, ডিজিটাল ভ্যাট ব্যবস্থাপনা এবং কর ফাঁকি রোধে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি।
রাজস্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র অটোমেশন নয়, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে করের আওতায় আনা এবং করদাতাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত না করলে রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়া কঠিন হবে।
নতুন অর্থবছরে আরও বড় চ্যালেঞ্জ
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দিয়েছে।
অর্থাৎ সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যগুলোর একটি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু কর আদায় বাড়ালেই হবে না; ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর ব্যবস্থায় আস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধারাবাহিক রাজস্ব ঘাটতি সরকারের উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত করতে পারে। একই সঙ্গে ঋণনির্ভরতা বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে সুদের চাপ ও বাজেট ঘাটতিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
তাদের মতে, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করের আওতা বৃদ্ধি, কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং করদাতাদের স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত করার দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

