ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

বাংলাদেশে প্রথম ফ্রি ট্রেড জোনে নতুন যুগের সূচনা, ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সুখবর এলসি ছাড়াই আমদানি

দৈনিক আজ ও আগামীকাল ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৬, ০১:৪৪ পিএম

বাংলাদেশে প্রথম ফ্রি ট্রেড জোনে নতুন যুগের সূচনা, ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সুখবর এলসি ছাড়াই আমদানি

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চালু হতে যাওয়া ফ্রি ট্রেড জোন (এফটিজেড) বা মুক্তবাণিজ্য এলাকার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিস্তারিত নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এ নির্দেশনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজীকরণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানিমুখী শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে ব্যবসায়ীদের জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংক এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে। এতে বলা হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ঘোষিত ফ্রি ট্রেড জোন সুবিধা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্য পরিবেশ গড়ে তোলার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংকিং কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হবে।

এলসি ছাড়াই চালানভিত্তিক আমদানির সুযোগ

নতুন নীতিমালার সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, এফটিজেডে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণপত্র (এলসি) ছাড়াই চালানভিত্তিক (কনসাইনমেন্ট) পদ্ধতিতে কাঁচামাল ও পণ্য আমদানি করতে পারবে।

এ ব্যবস্থায় উৎপাদনের আগে পর্যন্ত আমদানিকৃত পণ্যের মালিকানা বিদেশি সরবরাহকারীর কাছেই থাকবে। ফলে পণ্য বিক্রি বা উৎপাদনে ব্যবহারের আগ পর্যন্ত ব্যাংকগুলো এসব পণ্যকে আমদানিকারকের সম্পদ বা মজুত হিসেবে গণ্য করবে না। এতে ব্যাংকের ঋণঝুঁকি যেমন কমবে, তেমনি ব্যবসায়ীদের কার্যকর মূলধনের ওপরও চাপ কমবে।

ব্যবসায়ীরা প্রয়োজন অনুযায়ী কাঁচামাল ব্যবহার করে পরে মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন, যা উৎপাদন ব্যয় ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শুল্কমুক্ত কাঁচামাল, সহজ হবে উৎপাদন

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এফটিজেডে ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের আমদানি শুল্ক ছাড়াই কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য শিল্প উপকরণ আমদানি করতে পারবেন।

এসব কাঁচামাল ও পণ্য—

সংরক্ষণ,
প্রক্রিয়াজাতকরণ,
সংযোজন (অ্যাসেম্বলিং),
পুনঃমোড়কীকরণ (রিপ্যাকেজিং),
রিলেবেলিং,
এবং পুনঃরপ্তানির সুযোগ থাকবে।

তবে এসব পণ্য যদি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি করা হয়, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর পরিশোধ করতে হবে।

পাঁচ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণের সুযোগ

নতুন নীতিমালায় চালানভিত্তিক আমদানিকৃত কাঁচামাল ও পণ্য ৪৮ থেকে ৬০ মাস (সর্বোচ্চ পাঁচ বছর) পর্যন্ত ফ্রি ট্রেড জোনে সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে।

এছাড়া বায়ার্স ক্রেডিট ও সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটসহ বিলম্বিত মূল্য পরিশোধ (ডিফার্ড পেমেন্ট) ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ ২৭০ দিনের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করা যাবে।

ব্যাংকিং লেনদেনে স্পষ্ট নির্দেশনা

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংক এবং অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট (ওবিইউ) বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার আওতায় এফটিজেড-সংশ্লিষ্ট সব ধরনের লেনদেন পরিচালনা করবে।

এ সুবিধা পাবেন—

রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান,
উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান,
অনুমোদিত ট্রেডিং কোম্পানি,
এবং এফটিজেডে পরিচালিত লজিস্টিকস সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান।

সব ধরনের আর্থিক লেনদেন সম্পূর্ণ রূপান্তরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রায় সম্পন্ন করতে হবে।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়ম নির্ধারণ

নির্দেশনায় এফটিজেডভিত্তিক লেনদেনের ধরনও স্পষ্ট করা হয়েছে।

এর আওতায় দেশের অভ্যন্তরের কোনো প্রতিষ্ঠান যদি এফটিজেড থেকে পণ্য ক্রয় করে, তাহলে সেটি আমদানি হিসেবে গণ্য হবে। অন্যদিকে এফটিজেডে থাকা প্রতিষ্ঠানের জন্য সেই বিক্রয় হবে রপ্তানি।

এ ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এক্সপি (Export Permit) এবং আইএমপি (Import Permit)-সংক্রান্ত সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে।

ছোট-বড় সব শিল্প পাবে সুবিধা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এই ব্যবস্থায় ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো দেশের ভেতর থেকেই সহজে বিদেশি কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারবে।

অন্যদিকে বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশ থেকে কাঁচামাল আসার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করেই দ্রুত উৎপাদন শুরু করতে পারবে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি কমবে, রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা সহজ হবে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা আরও বাড়বে।

রপ্তানিতে আসবে নতুন গতি

ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, ফ্রি ট্রেড জোন চালু হলে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

সরবরাহ ব্যবস্থা আরও দক্ষ হবে, উৎপাদন ব্যয় কমবে, পণ্যের লিড টাইম হ্রাস পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

একই সঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানির বিনিয়োগ আকর্ষণ, আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং শিল্পায়নের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

আনোয়ারায় হচ্ছে দেশের প্রথম ফ্রি ট্রেড জোন

সরকার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় দেশের প্রথম আধুনিক ফ্রি ট্রেড জোন নির্মাণ করছে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, প্রকল্পটি চালু হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে গড়ে উঠবে। এর মাধ্যমে বৈদেশিক বিনিয়োগ, রপ্তানি আয়, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানে নতুন গতি সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন তারা।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!