ঢাকা শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

রংপুরের চার খুন: মাদকের জেরে নয়, পরিকল্পিত হত্যার সন্দেহ—তদন্তের ভুলে বাড়ছে রহস্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬, ০৫:০৭ পিএম

রংপুরের চার খুন: মাদকের জেরে নয়, পরিকল্পিত হত্যার সন্দেহ—তদন্তের ভুলে বাড়ছে রহস্য

ছবিঃ সংগৃহীত

রংপুরে সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্যের হত্যাকাণ্ড নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি তাৎক্ষণিক কোনো বিরোধ কিংবা মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে—পুলিশের প্রাথমিক বর্ণনার এমন ধারণা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে। বিভিন্ন তথ্য, প্রত্যক্ষ ও স্বজনদের বক্তব্য এবং প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণে হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে বলে সন্দেহ আরও জোরালো হচ্ছে।

ঘটনার পর দ্রুত দুই তরুণ সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করে মাদক সেবনের জেরে হত্যাকাণ্ডের একটি ব্যাখ্যা সামনে আনা হলেও পরবর্তী অনুসন্ধানে সেই বর্ণনার সঙ্গে বেশ কিছু তথ্যের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ফলে চার খুনের প্রকৃত কারণ, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী এবং এর নেপথ্যে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না—এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।

পুলিশের প্রাথমিক বর্ণনায় বড় প্রশ্ন

হত্যাকাণ্ডের পর রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সদ্য বিদায়ী কমিশনার মো. আব্দুল মাবুদ দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করেন। পুলিশের পক্ষ থেকে তখন দাবি করা হয়, মাদক সেবনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে এবং অভিযুক্তরা এ বিষয়ে জবানবন্দি দিয়েছে।

তবে পরবর্তী অনুসন্ধানে ওই জবানবন্দি ও ঘটনাস্থলের বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বেশ কিছু অসংগতি থাকার দাবি উঠে এসেছে। বিশেষ করে ঘটনার রাতে কথিত ইয়াবা সেবনের স্থান, অভিযুক্তদের গতিবিধি এবং ‘সীমান্ত’ নামের এক তরুণের মায়ের বক্তব্যের সঙ্গে মামলার এজাহারে উল্লেখিত তথ্যের পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ঘটনার সময় অভিযুক্তরা কীভাবে গণপতি চক্রবর্তীর বাসায় প্রবেশ করল, কীভাবে চারজনকে হত্যা করা হলো এবং এত বড় একটি ঘটনা ঘটলেও আশপাশের কেউ কেন কোনো শব্দ শুনতে পেলেন না—এসব বিষয়ও তদন্তে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি উঠেছে।

মাদক সেবনের তত্ত্ব নিয়েও প্রশ্ন

অনুসন্ধানে আরও প্রশ্ন উঠেছে, গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে ওঠার পথেই মাদক সেবনের উপযুক্ত জায়গা থাকার পরও অভিযুক্তরা কেন নীরবে একে একে চারজনকে হত্যা করবে।

যদি মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে হঠাৎ উত্তেজনা থেকে হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকে, তাহলে চারজনকে হত্যার ঘটনাটি কীভাবে এত নীরবে সংঘটিত হলো—এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে অভিযুক্তদের গতিবিধি, ঘটনাস্থলে তাদের উপস্থিতির সময় এবং মোবাইল ফোনের তথ্যও নতুন করে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

মোবাইল লোকেশনেও অসঙ্গতির দাবি

প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২১ আগস্ট রাত ৩টা থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত গণপতি চক্রবর্তী ও অভিযুক্তদের মোবাইল ফোন একই টাওয়ার এলাকার মধ্যে ছিল। তবে একই টাওয়ারের আওতায় থাকা মানেই তারা একই স্থানে ছিলেন—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

এই তথ্য থেকে প্রশ্ন উঠেছে, ঘটনার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকৃত অবস্থান কী ছিল এবং তারা কখন কোথায় গিয়েছিলেন, তা কি যথাযথভাবে প্রযুক্তিগতভাবে যাচাই করা হয়েছিল?

তদন্তে মোবাইল ফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), লোকেশন ডাটা, সম্ভাব্য চলাচলের পথ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করা হলে হত্যাকাণ্ডের সময়সীমা ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

১৫ লাখ টাকার প্রভিডেন্ট ফান্ডের গুঞ্জন

চার হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য আর্থিক কারণ হিসেবে গণপতি চক্রবর্তীর ১৫ লাখ টাকার প্রভিডেন্ট ফান্ড নিয়ে আলোচনা ও গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া ব্যাংকসংক্রান্ত নথির তথ্য অনুযায়ী, কাচারী বাজার সোনালী ব্যাংক শাখায় থাকা ওই প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে তিনি কোনো অর্থ উত্তোলন করেননি বলে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া তিনি এলপিআরে থাকায় পেনশনের অর্থ পাওয়ার সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ফলে শুধু ওই অর্থের জন্য হত্যাকাণ্ড ঘটেছে—এমন তত্ত্বও বর্তমানে স্পষ্ট ভিত্তি পাচ্ছে না।

তবে আর্থিক কোনো লেনদেন, সম্পত্তি বা অন্য কোনো অর্থনৈতিক স্বার্থ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে নিহত পরিবারের আর্থিক নথি, ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির কাগজপত্র এবং সাম্প্রতিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের ঘটনায় রহস্য

হত্যাকাণ্ডের তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে—গণপতি চক্রবর্তীর ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ পোল থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।

ঘটনার সময় নির্দিষ্ট ফিডারে প্রায় ১ ঘণ্টা ১৩ মিনিট লোডশেডিং ছিল বলে জানা গেলেও পোল থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি কেন ঘটেছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এই সংযোগ কে বিচ্ছিন্ন করেছিল, কখন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, এর ফলে ঘটনাস্থলে অন্ধকার সৃষ্টি হয়েছিল কি না এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তে খতিয়ে দেখা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনায় নেসকো এবং পুলিশের তদন্তের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনাস্থলের বৈদ্যুতিক অবকাঠামো, পোল, তার ও সংযোগের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে।

হত্যার আগে আতঙ্কে ছিলেন গণপতি

স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের বক্তব্যে উঠে এসেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তাদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের আগে গণপতি চক্রবর্তী বেশ কিছুদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে ভুগছিলেন।

তাঁর চায়ের দোকানি বন্ধু প্রদীপ এবং শ্যালিকার বক্তব্য অনুযায়ী, শেষ প্রায় দেড় মাস ধরে তিনি অস্বাভাবিকভাবে ঘর বন্ধ করে ঘুমাতেন। এমনকি রসিকতার ছলেও নিজের জীবননাশের আশঙ্কার কথা বলতেন বলে তারা জানান।

যদি সত্যিই হত্যাকাণ্ডের আগে তিনি কোনো হুমকি বা আশঙ্কা অনুভব করে থাকেন, তাহলে সেই আশঙ্কার উৎস কী ছিল—এ প্রশ্নের উত্তর চার খুনের রহস্য উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

নিহত আগামী চক্রবর্তীর চ্যাটেও ইঙ্গিত

কারমাইকেল কলেজে অধ্যয়নরত নিহত আগামী চক্রবর্তী মৃত্যুর আগে এক বন্ধুর সঙ্গে চ্যাট করেছিলেন বলে জানা গেছে। সেখানে তিনি একজন সরকারি চাকরিপ্রার্থীর বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।

ওই ব্যক্তির সঙ্গে আগামী চক্রবর্তীর কী ধরনের সম্পর্ক ছিল, কেন তিনি জিডির কথা ভাবছিলেন এবং বিষয়টির সঙ্গে চার হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না—এখন এসব প্রশ্নও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

নিহতের মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা, কল রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য ফরেনসিকভাবে বিশ্লেষণ করা হলে নতুন কোনো সূত্র পাওয়া যেতে পারে।

শেষ ফোনকল ঘিরেও প্রশ্ন

গণপতি চক্রবর্তীর ব্যবহৃত শেষ ফোনের ইনকামিং ও আউটগোয়িং কল রেকর্ড বিশ্লেষণেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, তাঁর ফোনে সর্বশেষ কলটি আসে ২০ আগস্ট বিকেলে তাঁর স্ত্রীর মোবাইল নম্বর থেকে। পরে ২১ আগস্ট ভোর ৬টা ৫ মিনিটে ফোনটি বন্ধ হয়ে যায়।

এই সময়সীমার মধ্যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল কি না, ফোনটি কার কাছে ছিল এবং ফোন বন্ধ হওয়ার প্রকৃত কারণ কী—এসব বিষয়ও তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা?

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী এখন স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঘাতকেরা জবানবন্দিতে মাদক সেবনের কথা বলে তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করে থাকতে পারে।

এ বক্তব্য চার হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ, যদি মাদক সেবনের বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে তদন্তের গতিপথ অন্যদিকে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও নেপথ্যের ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।

পুনঃতদন্তের দাবি

চার হত্যাকাণ্ডের পর প্রাথমিক তদন্তে যেসব তথ্য সামনে এসেছিল, সেগুলোর সঙ্গে পরবর্তী অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্যের অসঙ্গতি এবং নতুন প্রশ্নের কারণে ঘটনাটির নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ পুনঃতদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।

বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য, পরিকল্পনাকারী, নিহত পরিবারের পূর্ববর্তী হুমকি বা বিরোধ, মোবাইল ফোনের তথ্য, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের ঘটনা, সিসিটিভি ফুটেজ, আর্থিক লেনদেন এবং অভিযুক্তদের জবানবন্দি—সবকিছু নতুন করে যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে।

মূল রহস্য এখনো অমীমাংসিত

চারজন মানুষকে একই পরিবারের মধ্যে হত্যা করার মতো ভয়াবহ ঘটনায় শুধু তাৎক্ষণিক বিরোধ বা মাদক সেবনের ব্যাখ্যা দিয়ে তদন্ত শেষ করা হলে প্রকৃত রহস্য আড়াল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সব সম্ভাব্য উদ্দেশ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

স্বজনেরা এখনও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানা গেছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও নেপথ্যের ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

রংপুরের এই চাঞ্চল্যকর চার খুনের ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এটি কি সত্যিই মাদককে কেন্দ্র করে আকস্মিক হত্যাকাণ্ড, নাকি এর পেছনে ছিল আরও গভীর ও পূর্বপরিকল্পিত কোনো ষড়যন্ত্র? সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে একটি নিরপেক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ওপর।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!