রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় একটি দোতলা বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষকসহ একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। বাড়ির ভেতর আসবাবপত্র ও বিভিন্ন জায়গা তছনছ অবস্থায় পাওয়া যাওয়ায় ঘটনাটি ডাকাতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাত প্রায় ১১টার দিকে নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় নিজেদের বাড়ি থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ফোনে সাড়া না পেয়ে বাসায়, এরপর ভয়াবহ দৃশ্য
নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তী শনিবার রাতে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেই প্রথম সন্দেহ করেন। একে একে বোন, ভগ্নিপতি, ভাগনি ও ভাগনের ফোনে কল করলেও কোনো নম্বরেই সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না।
কাঁদতে কাঁদতে পূজা বলেন, “শনিবার রাত পৌনে ৯টার দিকে ফোন দিছি। আমার দিদির ফোনেও ফোন ঢোকে না, দুঃখিত বলে। জামাইবাবুর ফোনেও ফোন ঢোকে না। ভাগনির ফোনেও ফোন ঢোকে না। আর প্রিয়ম যে ক্লাস ফাইভে পড়ে, ওর একটা বাটন ফোন আছে, সেটাতেও ফোন ঢোকে না। পরে এসে দেখি তালাবদ্ধ, পুরো বাসা অন্ধকার। কারো কোনো সাড়াশব্দ নেই।”
স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত বোনের বাসায় ছুটে যান পূজা। সেখানে গিয়ে দেখেন বাড়ির প্রধান দরজা তালাবদ্ধ। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। পরে প্রতিবেশীদের সহায়তায় পাশের বাড়ির দিক দিয়ে দেয়াল টপকে জানালার কাছে যান তারা।
জানালা দিয়ে ঢুকেই ছড়ানো-ছিটানো ঘর
পূজা চক্রবর্তী জানান, জানালার থাই গ্লাসে ধাক্কা দেওয়ার পর সেটি খুলে যায়। এরপর মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে ঘরের ভেতরে তাকাতেই চোখে পড়ে ভয়াবহ দৃশ্য।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়ারড্রবের ড্রয়ার খোলা এবং কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। পরে খোঁজাখুঁজি করে পরিবারের সদস্যদের মরদেহ দেখতে পান তারা।
পূজা বলেন, তার ভাগনির মরদেহ ছিল খাটের নিচে। বড় বোন প্রীতিলতার মরদেহ ছিল সিঁড়িতে এবং তার ওপর মেয়ে প্রার্থীর মরদেহ পড়ে ছিল। পরে ছাদ থেকেও গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ দৃশ্য দেখে তিনি চিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
দুই থেকে তিন দিন আগেই হত্যার আশঙ্কা
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তী জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৃহস্পতিবার অথবা শুক্রবারের কোনো এক সময় চারজনকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, নিহতদের গলায় দড়ি ও গামছা প্যাঁচানো অবস্থায় পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যার আলামত পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে পুরো বাড়ি তছনছ অবস্থায় রয়েছে।
পুলিশের ধারণা, ঘটনাটি ডাকাতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে।
বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, তছনছ ঘর
রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী জানান, ঘটনাস্থলের প্রাথমিক পরিস্থিতি দেখে ধারণা করা হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডটি দুই থেকে তিন দিন আগে ঘটেছে।
তিনি বলেন, বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা ছিল। ঘরের ভেতরের আসবাবপত্র এবং যেসব স্থানে স্বর্ণালংকার রাখা হতো বলে ধারণা করা হয়, সেসব জায়গা ভাঙা ও তছনছ অবস্থায় পাওয়া গেছে।
সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেছে। কীভাবে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং উদ্দেশ্য কী ছিল—এসব বিষয় সামনে রেখে তদন্ত শুরু হয়েছে।
বাড়ির বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার চার মরদেহ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, দোতলা বাড়িটির প্রধান গেট তালাবদ্ধ ছিল। তালা ভেঙে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ভেতরে প্রবেশ করেন।
এরপর দোতলার একটি ঘরের খাটের নিচ থেকে প্রিয়মের মরদেহ, তিনতলায় ওঠার সিঁড়ি থেকে প্রীতিলতা ও প্রার্থী চক্রবর্তীর মরদেহ এবং ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মরদেহগুলো উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর ধরন ও সময় সম্পর্কে আরও নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নতুন বাড়িতে উঠেছিলেন পরিবারটি
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গণপতি চক্রবর্তীর দোতলা বাড়িটির নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। সম্প্রতি তিনি পরিবার নিয়ে বাড়িটির দোতলায় বসবাস শুরু করেন। নিচতলার অংশ অনেকটাই ফাঁকা ছিল।
পরিবারটি সেখানে নতুন বসবাস শুরু করায় আশপাশের প্রতিবেশীদের সঙ্গেও খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেনি। ফলে হত্যাকাণ্ডের আগে বা পরে বাড়িতে কারা আসা-যাওয়া করেছে, সে বিষয়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, শনিবার দুপুরের দিকে ওই বাড়িতে একটি পার্সেল পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু দরজা না খোলায় পার্সেল নিয়ে আসা ব্যক্তি ফিরে যান। পরে ওই তথ্যও তদন্তকারীদের নজরে এসেছে।

ডাকাতি, নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—খতিয়ে দেখছে পুলিশ
বাড়ির ভেতরে জিনিসপত্র তছনছ, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং মূল্যবান সামগ্রী রাখার জায়গাগুলো ভাঙা থাকার কারণে প্রাথমিকভাবে ডাকাতির বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে চারজনকে পৃথক স্থানে রেখে শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় এটি নিছক ডাকাতি, নাকি ডাকাতির আড়ালে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—সেটিও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ঘটনার আগে পরিবারের সদস্যদের কারও সঙ্গে বিরোধ ছিল কি না, বাইরে থেকে কেউ নিয়মিত যাতায়াত করত কি না, বাড়িতে প্রবেশের অন্য কোনো পথ ছিল কি না এবং হত্যার পর কী কী জিনিস খোয়া গেছে—এসব বিষয়ও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
পুলিশ ও সিআইডির পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দল ঘটনাস্থলে কাজ করছে। ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
‘আমাদের জীবনের নিশ্চয়তা কী?’
বোন ও ভাগনিদের হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন পূজা চক্রবর্তী। তিনি বলেন, গণপতি চক্রবর্তী অত্যন্ত শান্ত ও ভালো মানুষ ছিলেন। অনেক কষ্ট করে বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। এমন একটি পরিবারের চার সদস্যকে এভাবে হত্যা করার ঘটনায় তিনি হতবাক।
তার প্রশ্ন, “তাদের সবাইকে এভাবে মেরে ফেলল। আমাদের জীবনের নিশ্চয়তা কী?”
তিনি দ্রুত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রংপুরজুড়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। নিহত গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হওয়ায় তার সাবেক সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ঘটনার প্রতিবাদ এবং দ্রুত বিচার দাবিতে রংপুর জিলা স্কুল ও কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন।
এদিকে ঘটনার পর রাতেই রংপুর মহানগর বিএনপির নেতারাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) আবদুল মাবুদ জানিয়েছেন, ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। ডিবি, সিআইডিসহ পুলিশের সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো সমন্বিতভাবে তদন্ত করছে।
চারজনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘিরে এখন একটাই প্রশ্ন—কারা কী উদ্দেশ্যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে? ডাকাতির উদ্দেশ্যেই কি পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো পরিকল্পিত কারণ—তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই রহস্যই এখন রংপুরবাসীর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে থাকছে।

