রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের রাজবাড়ী শহর থেকে পাংশা উপজেলার শিয়ালডাঙ্গি পর্যন্ত প্রায় ৩১ কিলোমিটার সড়ক যেন ক্রমেই পরিণত হচ্ছে মৃত্যুফাঁদে। ব্যস্ত এই মহাসড়কে গত দেড় বছরে ৬২টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫ জন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১১৫ জন।
পাংশা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ আল মামুনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মহাসড়কের এই অংশে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, নছিমন, করিমন ও ভটভটিসহ বিভিন্ন ধরনের তিন চাকার যানবাহনের অবাধ চলাচল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা।
মাত্র ৫২ দিনেই ৭ দুর্ঘটনা, প্রাণ গেল ৫ জনের
সাম্প্রতিক সময়ের দুর্ঘটনার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। গত ১২ জুন থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ৫২ দিনে মহাসড়কের রাজবাড়ী-পাংশা অংশে অন্তত সাতটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পাঁচজন নিহত এবং অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।
গত ১২ জুন কালুখালীতে প্রাইভেটকার ও ব্যাটারিচালিত রিকশার সংঘর্ষে এক শিশু নিহত হয়। এ ঘটনায় আহত হন আরও পাঁচজন।
২২ জুন একই উপজেলার এলাকায় ট্রাক ও প্রাইভেটকারের সংঘর্ষে এক যুবকের মৃত্যু হয়। একই দিনে পাংশায় বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে তিনজন আহত হন।
এর এক সপ্তাহ পর, ২৯ জুন কালুখালীতে ট্রাক ও প্রাইভেটকারের সংঘর্ষে এক কৃষি কর্মকর্তাসহ ছয়জন আহত হন। পরে আহতদের একজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
১ জুলাই একই এলাকায় বাস ও পিকআপের সংঘর্ষে একজন নিহত হন। পরদিন চন্দনী এলাকায় মুরগিবাহী পিকআপ ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে আরও একজন নিহত এবং একজন আহত হন।
সর্বশেষ ৩ আগস্ট কালুখালীতে গোল্ডেন লাইন পরিবহনের একটি বাস ও মাহেন্দ্রের সংঘর্ষে মাহেন্দ্রচালক নিহত হন। এ ঘটনায় আরও পাঁচজন আহত হন।
মহাসড়কজুড়ে তিন চাকার দাপট
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এবং সরেজমিনে দেখা যায়, রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে। এর মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, নছিমন, করিমন, ভটভটিসহ বিভিন্ন ধরনের ধীরগতির তিন চাকার যানবাহনের উপস্থিতি চোখে পড়ে বেশি।
মহাসড়কে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ব্যক্তিগত গাড়ির সঙ্গে এসব ধীরগতির যানবাহন একই সড়কে চলাচল করায় অনেক সময় তৈরি হচ্ছে বিপজ্জনক পরিস্থিতি। বিশেষ করে হঠাৎ করে লেন পরিবর্তন, মহাসড়কের ওপর যাত্রী ওঠানামা এবং দ্রুতগতির যানবাহনকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
অতিরিক্ত গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং
শুধু তিন চাকার যানবাহনই নয়, মহাসড়কে চলাচলকারী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকের চালকদের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অভিযোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক চালক ট্রাফিক আইন উপেক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওভারটেকিং করেন। কোথাও কোথাও যানবাহন অতিরিক্ত গতিতে চলাচল করায় সামান্য ভুলও বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মহাসড়কের কয়েকটি অংশে থাকা বিপজ্জনক বাঁকও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এসব স্থানে পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সাইন, গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সড়কবাতি বা অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত কি না—সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অভিযান চালাতে ‘মব কালচারের’ বাধা
পাংশা হাইওয়ে থানার ওসি সৈয়দ আল মামুন বলেন, অধিকাংশ দুর্ঘটনার পেছনে তিন চাকার যানবাহনের চলাচল, ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং অতিরিক্ত গতির ভূমিকা রয়েছে।
তিনি জানান, মহাসড়কে অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে অনেক সময় ‘মব কালচারের’ কারণে বাধার মুখে পড়তে হয়। তবে এসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও হাইওয়ে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে এবং অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শুধু দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নিলে এই মহাসড়কে প্রাণহানি কমানো সম্ভব হবে না। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেখানে স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তাঁদের দাবি, মহাসড়কে অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচল বন্ধের পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, নছিমন, করিমন ও ভটভটার মতো যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে বাস ও ট্রাকের অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বন্ধ, চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁকগুলোতে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, রোড মার্কিং, প্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা ও গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
প্রতির যাত্রায় আতঙ্কদিনে
রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কটি স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কপথ। ফলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করেন। কিন্তু একের পর এক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক।
দেড় বছরে ৬২ দুর্ঘটনায় ৩৫ জনের মৃত্যু এবং ১১৫ জন আহত হওয়ার পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, ৩১ কিলোমিটারের এই সড়ক অংশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা কতটা জরুরি। এখন দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়াই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

