দীর্ঘ ১৫-১৬ বছরের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণের ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, "হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশের মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে, তারা পরিবর্তন আনতে পারে।"
রোববার (১৯ জুলাই) রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘জুলাই শহীদ সাংবাদিক সম্মাননা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি)। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদুর রহমান।
জুলাইয়ের আত্মত্যাগ ইতিহাসের অংশ
মির্জা ফখরুল বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে শহীদ হওয়া ছাত্র-শ্রমিক-জনতা এবং দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রাণ দেওয়া মানুষের আত্মত্যাগ জাতির জন্য এক গভীর বেদনার স্মৃতি। শহীদদের পরিবারের সামনে দাঁড়ালে নিজেকে অপরাধী মনে হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনে অসংখ্য মানুষ গুম, নির্যাতন ও কারাবরণের শিকার হয়েছেন। তাই এই আত্মত্যাগ যেন কখনও বিস্মৃত না হয়, সে জন্য ইতিহাস সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরা প্রয়োজন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পরই ফ্যাসিবাদের পথ তৈরি হয়
বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মধ্য দিয়েই একদলীয় ও ফ্যাসিবাদী শাসনের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে এবং বিরোধী মত দমনে হত্যা, গুম ও নির্যাতনের পথ বেছে নেয়।
তার ভাষায়, রাষ্ট্রের বিভিন্ন সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছিল।
রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে
মির্জা ফখরুল বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। তবে মাত্র অল্প সময়ের মধ্যে দীর্ঘ ১৫ বছরের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতি আস্থা রেখে সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে। সংস্কারের পাশাপাশি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন।
বিএনপি নির্বাচনের মাধ্যমেই পরিবর্তনে বিশ্বাসী
বিএনপিকে একটি উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি কোনো বিপ্লবী দল নয়; বরং নির্বাচন ও জনগণের রায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশ্বাস করে।
তিনি জানান, দলের ঘোষিত ৩১ দফা, জুলাই সনদ এবং জনগণের সঙ্গে করা অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জুলাই সনদ নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। আর যেসব বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলো নির্বাচিত সরকার নিজ নিজ নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী বাস্তবায়ন করবে।
এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকার পরও অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংবিধান সংস্কারে আলোচনার ওপর জোর
সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, আন্দোলনের পাশাপাশি এখন আলোচনার রাজনীতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার করা সম্ভব।
তিনি বলেন, জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতেই একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
গুম ও শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান
বিএনপি মহাসচিব দাবি করেন, দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী কারাবন্দি হয়েছেন, লাখ লাখ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং প্রায় ১ হাজার ৭০০ নেতাকর্মী গুমের শিকার হয়েছেন।
তিনি বলেন, শহীদ ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। সরকারের কিছু উদ্যোগ থাকলেও তা আরও কার্যকর ও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।
‘পরিবর্তন আসবেই’
মির্জা ফখরুল বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অধিকার আদায়ের জন্য আর কাউকে প্রাণ দিতে হবে না। মতভেদ থাকলেও সংঘাত নয়, আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান খুঁজতে হবে।
তিনি বলেন, "বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তন আনতে সক্ষম। সেই বিশ্বাস থেকেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। পরিবর্তন অবশ্যই আসবে।"

