জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সরকারি বাসভবনে ‘জুলাই এখনো শেষ হয় নাই’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৪৭ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের ছবি স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে। তবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উপস্থাপনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উল্লেখ থাকলেও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এবং মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান বা ভূমিকার কোনো উল্লেখ না থাকায় আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাজধানীর ২৯ মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে আয়োজিত প্রদর্শনীতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন আলোকচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
প্রদর্শনীর মুক্তিযুদ্ধ-সংক্রান্ত অংশে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিরোধের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলকে ঘিরে জামায়াতের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলনও বিভিন্ন ছবির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তবে প্রদর্শনীতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা, বিশেষ করে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি উল্লেখ না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থান ও ভূমিকা নিয়েও কোনো আলোকচিত্র বা ব্যাখ্যা প্রদর্শনীতে রাখা হয়নি বলে দর্শনার্থীরা জানান।
এক দর্শনার্থী বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রদর্শনীতে তাঁর ভূমিকার উল্লেখ ইতিবাচক হলেও ইতিহাস উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কাউকে বাদ দেওয়া বা কোনো পক্ষকে খাটো করা উচিত নয়। তাঁর মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এবং স্বাধীনতার ঘোষণা-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক বিতর্কও থাকা প্রয়োজন ছিল। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থানও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা যেত।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম-২ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, প্রদর্শনীটিকে পুরো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষ্য, এখানে মূলত আওয়ামী লীগের শাসনকে স্বৈরাচার, বাকশাল ও গণতন্ত্র হরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে ১৯৪৭, ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক বার্তা তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, যদি এটিকে বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস হিসেবে উপস্থাপন করা হতো, তাহলে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টিও সেখানে থাকা উচিত ছিল। তাঁর মতে, প্রদর্শনীর মূল ফোকাস ছিল আওয়ামী লীগের শাসনব্যবস্থা, শেখ মুজিবুর রহমানের পরবর্তী শাসনামল এবং শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা রাজনৈতিক অভিযোগগুলো তুলে ধরা।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার প্রদর্শনী প্রসঙ্গে সংক্ষেপে বলেন, “আমরা মুক্তিযুদ্ধের অবিকৃত ইতিহাস চাই।”
আগেও স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন জামায়াত আমির
এর আগে ২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে ঢাকার পল্টনে জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ আয়োজিত এক সমাবেশে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি প্রশ্ন করেন, “কেন যিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান সাহেব, তার স্বীকৃতি নেই?”
একই অনুষ্ঠানে শেখ মুজিবুর রহমান কবে ও কোথায় স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
এবারের আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা স্থান পেলেও জিয়াউর রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা অনুল্লেখিত থাকায় বিষয়টি নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় এসেছে।

