ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

জাতীয় কাউন্সিল সামনে রেখে বিএনপিতে বড় পুনর্গঠন, আসছে নতুন মুখ ও ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ২২, ২০২৬, ১০:৪৮ এএম

জাতীয় কাউন্সিল সামনে রেখে বিএনপিতে বড় পুনর্গঠন, আসছে নতুন মুখ ও ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতি

ছবিঃ সংগৃহীত

জাতীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে দল পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া জোরদার করেছে বিএনপি। এরই অংশ হিসেবে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামোয় নেতৃত্ব পরিবর্তন, নতুন মুখকে সামনে আনা, দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস এবং বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে দলটি।

দলীয় সূত্রের দাবি, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি বা মার্চে বিএনপির সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। কাউন্সিলের আগে আগামী চার-পাঁচ মাসজুড়ে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কার্যক্রম চলতে পারে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও মহানগর ইউনিটে নতুন কমিটি গঠন এবং পুরোনো কমিটিতে পরিবর্তনের কাজ শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়াটিও দৃশ্যমান হয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, চলতি সপ্তাহে কেন্দ্রীয় দপ্তরের দায়িত্বেও নতুন মুখ আসতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে আরও পদায়ন ও দায়িত্বে রদবদল হতে পারে।

তরুণ ও ক্লিন ইমেজের নেতৃত্বে গুরুত্ব

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের পুনর্গঠনে দুটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—তরুণ, মেধাবী ও অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের সামনে আনা এবং সাংগঠনিক নেতৃত্বে বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা।

দলীয় সূত্রের ভাষ্য, সরকার পরিচালনা ও দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের জেলা, মহানগর কিংবা উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ সাংগঠনিক পদে না রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এর মাধ্যমে ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতিকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এ নীতির পক্ষে রয়েছেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

দলটির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় বলা হচ্ছে, একজন মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য যদি একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্বেও থাকেন, তাহলে সরকারের দায়িত্ব ও দলীয় কর্মকাণ্ড—দুই জায়গাতেই সময় ও মনোযোগ ভাগ হয়ে যায়। তাই নেতৃত্বের দায়িত্ব পৃথক করা হলে সরকার পরিচালনা এবং দলীয় সংগঠন—উভয় ক্ষেত্রেই কার্যকারিতা বাড়তে পারে।

জিয়াউর রহমানের সময়কার মডেল সামনে

দল ও সরকারের দায়িত্ব আলাদা রাখার ক্ষেত্রে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সময়কার সাংগঠনিক কাঠামোকেও উদাহরণ হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে।

দলীয় সূত্রের ভাষ্য, ওই সময়ে সরকার ও দলের দায়িত্ব পৃথক রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের অনেকেই সাংগঠনিক পদ থেকে সরে গিয়ে সরকারি দায়িত্বে মনোযোগ দিয়েছিলেন।

বিএনপির বর্তমান পুনর্গঠনেও একই ধরনের কাঠামো অনুসরণের বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে শেষ পর্যন্ত কোন কোন পদে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলীয় হাইকমান্ডই নেবে।

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের ভূমিকাও বিবেচনায়

নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু সাংগঠনিক দক্ষতা কিংবা জনপ্রিয়তাই নয়, বিগত ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নেতাদের ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

দীর্ঘ সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে সক্রিয় থাকা নেতাদের সাংগঠনিকভাবে মূল্যায়ন করে সামনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে অপেক্ষাকৃত তরুণ ও নতুন প্রজন্মের নেতাদের জন্য কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল সংগঠনে জায়গা তৈরি করার চিন্তাও রয়েছে।

স্থায়ী কমিটিতে নতুন মুখ, শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ

দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতেও পরিবর্তন এসেছে। রুহুল কবির রিজভী, আমান উল্লাহ আমান, অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার ও মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটিতে বর্তমানে কয়েকটি পদ শূন্য রয়েছে। একইভাবে মৃত্যু, পদত্যাগ ও বহিষ্কারের কারণে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যানের একাধিক পদও খালি রয়েছে। এসব শূন্য পদে প্রবীণ ও মধ্যম সারির নেতাদের মধ্য থেকে নতুন নেতৃত্ব আনার উদ্যোগ চলছে।

দলীয় সূত্রের দাবি, কাউন্সিলের আগে কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন শূন্য পদ পূরণ এবং সাংগঠনিক দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের কাজ শেষ করার চেষ্টা থাকবে।

কেন্দ্রীয় দপ্তরেও আসছে পরিবর্তন

দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরের দায়িত্বে পরিবর্তনের বিষয়েও আলোচনা চলছে। যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ও সৈয়দ এমরান সালেহ—এই তিনজনের মধ্যে কাউকে কেন্দ্রীয় দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

কেন্দ্রীয় দপ্তরের পাশাপাশি ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল ও শ্রমিক দলসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনেও নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে। আগস্টের শেষ দিকে অথবা সেপ্টেম্বরের শুরুতে ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসতে পারে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।

তৃণমূলেও চলছে কমিটি পুনর্গঠন

শুধু কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নয়, জেলা, মহানগর, উপজেলা ও থানা পর্যায়েও সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কাজ চলছে।

ইতোমধ্যে বিভিন্ন ইউনিটে আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন, দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় সংগঠনকে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব ইউনিটে সাংগঠনিক কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে কমিটি পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে দল থেকে বহিষ্কৃত নেতাদের আবেদন যাচাই করে যোগ্যতা ও সাংগঠনিক ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে তাদের পুনরায় দলে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

‘পুনর্গঠনের কাজ কাউন্সিলের মাধ্যমে শেষ হবে’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘দল পুনর্গঠনের কাজ চলমান রয়েছে, যা দলের জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে শেষ হবে। যেসব জেলা, উপজেলা ও থানায় কমিটি দেওয়া খুব জরুরি, সেগুলো পুনর্গঠন করা হচ্ছে।’

তিনি জানান, বর্তমানে সীমিত পরিসরে সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে, যা আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে জাতীয় কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে সারা দেশের সাংগঠনিক কাঠামোয় ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘কাউন্সিল সামনে রেখে দল পুনর্গঠনের কাজ চলমান রয়েছে। বিভিন্ন ইউনিটে নতুন কমিটি গঠনের কাজ চলছে। সম্প্রতি বেশ কিছু জায়গায় নতুন কমিটি দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোও চলমান রয়েছে।’

তার ভাষ্য, সারা দেশের ইউনিট কমিটিগুলো পুনর্গঠনের পর বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে।

কাউন্সিল ঘিরে সামনে বড় সাংগঠনিক পরীক্ষা

দলীয় সূত্র অনুযায়ী, আগামী কয়েক মাস বিএনপির জন্য সাংগঠনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস থেকে শুরু করে তৃণমূলের কমিটি পুনর্গঠন—সবকিছুই জাতীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নতুন মুখকে সামনে আনা, তরুণ নেতৃত্বের বিকাশ, দায়িত্বের বিকেন্দ্রীকরণ, ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতি কার্যকর এবং আন্দোলনে সক্রিয় নেতাদের মূল্যায়নের মাধ্যমে বিএনপিকে আরও গতিশীল সাংগঠনিক কাঠামোর দিকে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে দলটির।

তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে এবং জাতীয় কাউন্সিলে শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বের কাঠামোয় কতটা পরিবর্তন আসবে—সেদিকেই এখন নজর দলটির নেতাকর্মীদের।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!