আধুনিক নগরায়ণের স্বপ্ন দেখিয়ে শেয়ারবাজার থেকে বন্ডের মাধ্যমে ১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল বেক্সিমকো গ্রুপের আবাসন প্রতিষ্ঠান শ্রীপুর টাউনশিপ লিমিটেড। রাজধানীর উপকণ্ঠে ‘মায়ানগর’ নামে একটি আধুনিক টাউনশিপ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিতে অর্থ সংগ্রহ করা হলেও ওই অর্থের বড় একটি অংশ প্রকল্পে ব্যয় না করে আর্থিক কারসাজির মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের নিয়ন্ত্রণে ফেরত নেওয়ার প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
বিএসইসির তদন্তে জালিয়াতি, ভুয়া তথ্য উপস্থাপন, আর্থিক অনিয়ম এবং সম্ভাব্য মানি লন্ডারিংয়ের মতো গুরুতর অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। ফৌজদারি তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে—এমন অভিযোগগুলো অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) পাঠানো হয়েছে।
বন্ডের অর্থ কোথায় গেল?
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর মেয়াদি ‘আইএফআইসি গ্যারান্টিড শ্রীপুর টাউনশিপ জিরো কুপন বন্ড’ ইস্যুর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়।
বন্ড অনুমোদনের অন্যতম শর্ত ছিল পর্যাপ্ত পরিশোধিত মূলধন থাকা। শ্রীপুর টাউনশিপের কাগজপত্রে ৩৩৫ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন দেখানো হলেও তদন্তে ওই মূলধনের প্রকৃত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই অর্থ বারবার ব্যাংক হিসাবে জমা ও উত্তোলনের মাধ্যমে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের একটি কৃত্রিম চিত্র তৈরি করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে বন্ড অনুমোদনের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষায়, এটি ছিল কথিত আর্থিক কারসাজির প্রথম ধাপ।
প্রকল্প উন্নয়নের নামে ৮০০ কোটির বেশি স্থানান্তর
বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পর দ্বিতীয় ধাপে প্রকল্প উন্নয়ন ব্যয়ের নামে বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তরের তথ্য পেয়েছে বিএসইসি।
তদন্তে দেখা গেছে, ৮০০ কোটির বেশি টাকা প্রকল্পের চুক্তিবদ্ধ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। নথিপত্রে এসব অর্থকে প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়েছিল।
তবে তদন্ত চলাকালে বেক্সিমকো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রতিনিধিরা বিএসইসিকে জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি কথিত প্রকল্পে কোনো নির্মাণকাজ করেনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজ না করেও তাদের হিসাবে জমা হওয়া অর্থ পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষ ও শ্রীপুর টাউনশিপের ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
একই গ্রুপের দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অর্থ স্থানান্তর
বিএসইসির তদন্তে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে শ্রীপুর টাউনশিপ ও বেক্সিমকো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো।
দুটি প্রতিষ্ঠানই একই গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয়ের নামে এক প্রতিষ্ঠান থেকে আরেক প্রতিষ্ঠানে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অর্থ স্থানান্তর করে পরবর্তী সময়ে তা আবার উদ্যোক্তাদের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের লেনদেন প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয়, বিনিয়োগকারীদের অর্থের ব্যবহার এবং বন্ডের অর্থের গন্তব্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিএসইসির তদন্তে ফৌজদারি অপরাধের আলামত
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম জানিয়েছেন, তদন্তে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি প্রতারণা, জালিয়াতি ও সংঘবদ্ধ আর্থিক অপরাধের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অভিযোগ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় সম্পৃক্ত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আর যেসব অভিযোগের জন্য ফৌজদারি তদন্ত প্রয়োজন, সেগুলো সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে।
অর্থাৎ বন্ডের অর্থ সংগ্রহ থেকে শুরু করে তা প্রকল্পে ব্যবহার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর এবং পরবর্তী লেনদেন—পুরো প্রক্রিয়াটিই এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার তদন্তের আওতায় আসছে।
দেড় দশকের অনিয়ম খতিয়ে দেখার অংশ হিসেবে তদন্ত
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের শেয়ারবাজারে গত দেড় দশকে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম ও কারসাজি খতিয়ে দেখতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে ওই বছরের ১ সেপ্টেম্বর একটি বিশেষ অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল শ্রীপুর টাউনশিপ, বেক্সিমকো ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বেক্সিমকো গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা হয়।
এরপর ওই অনুসন্ধানের সুপারিশের ভিত্তিতে ২৭ আগস্ট বিএসইসি তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি বন্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান, ট্রাস্টি, নিরীক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন পর্যালোচনা করে।
সেই তদন্তেই কথিত জালিয়াতি, ভুয়া তথ্য উপস্থাপন ও আর্থিক কারসাজির বিভিন্ন তথ্য সামনে আসে।
‘মায়ানগর’-এর স্বপ্ন ছিল ১৮ হাজার অ্যাপার্টমেন্ট
শ্রীপুর টাউনশিপের ‘মায়ানগর’ প্রকল্পকে একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
প্রকল্প পরিকল্পনায় প্রায় ১৮ হাজার অ্যাপার্টমেন্টের পাশাপাশি হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পার্ক, শপিংমল ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের কথা ছিল।
প্রকল্পটির মালিকানায় বেক্সিমকো গ্রুপের অংশ ছিল ৭৫ শতাংশ এবং শ্রীপুর টাউনশিপ লিমিটেডের অংশ ২৫ শতাংশ।
বিনিয়োগকারীদের সামনে আধুনিক নগরায়ণের এমন আকর্ষণীয় পরিকল্পনা তুলে ধরে বন্ডের মাধ্যমে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করা হলেও সেই অর্থের বড় অংশ প্রকল্পে আদৌ ব্যবহার হয়েছে কি না, তদন্তে সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার ঝুঁকি কতটা?
বিএসইসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বন্ডটির শতভাগ গ্যারান্টার আইএফআইসি ব্যাংক। ফলে শ্রীপুর টাউনশিপ বন্ডের দায় পরিশোধে ব্যর্থ হলে বিনিয়োগকারীদের মূলধন ও নির্ধারিত রিটার্ন পরিশোধের দায় ব্যাংকের ওপর বর্তাবে।
এ কারণে অনিয়ম বা জালিয়াতির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলেও বন্ডধারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত অবস্থান রয়েছে বলে মনে করছে কমিশন।
তবে প্রকল্পের নামে সংগৃহীত অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, কারা এর সুবিধাভোগী এবং ৮০০ কোটির বেশি অর্থ স্থানান্তরের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখন নির্ভর করছে সিআইডিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার পরবর্তী তদন্তের ওপর।

