ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

কারসাজিতে ক্ষতবিক্ষত শেয়ারবাজার, প্রশ্নের মুখে বিএসইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুলাই ২৬, ২০২৬, ১০:৩৬ এএম

কারসাজিতে ক্ষতবিক্ষত শেয়ারবাজার, প্রশ্নের মুখে বিএসইসি

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের পুঁজিবাজারে গত দেড় দশকে একের পর এক শেয়ার কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং, ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন, প্লেসমেন্ট শেয়ার কেলেঙ্কারি এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন লাখো সাধারণ বিনিয়োগকারী। বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব অনিয়ম প্রতিরোধে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং দুর্বল তদন্ত, নামমাত্র জরিমানা, দীর্ঘসূত্রতা এবং মামলার ধীরগতির কারণে কারসাজিকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারবাজারে সংঘটিত বহু আলোচিত জালিয়াতির ঘটনায় হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত হয়নি। ফলে বাজারে সুশাসনের পরিবর্তে তৈরি হয়েছে দায়মুক্তির সংস্কৃতি, যার খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

নামমাত্র জরিমানা, কোটি টাকার লুট

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শেয়ারের কৃত্রিম মূল্য বৃদ্ধি করে শত শত কোটি টাকা মুনাফা অর্জনের পর অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মাত্র কয়েক লাখ বা কয়েক কোটি টাকা জরিমানা করেছে বিএসইসি। এতে অপরাধীদের প্রকৃত ক্ষতি না হয়ে বরং ভবিষ্যতে একই ধরনের কারসাজির উৎসাহ বেড়েছে।

ট্রাস্ট ব্যাংক সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী ফখরুল ইসলাম বলেন, "নিয়ন্ত্রক সংস্থার খামখেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। হঠাৎ করেই কোনো কোম্পানিকে জেড ক্যাটাগরিতে পাঠানো, নীতিমালার পরিবর্তন কিংবা অস্বচ্ছ সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন।"

তার ভাষায়, "কারসাজিকারীরা হাজার কোটি টাকা আয় করে সামান্য জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। এতে বাজারে আস্থা ফিরছে না।"

মামলা আছে, বিচার নেই

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিএসইসি বিভিন্ন সময়ে তদন্ত কমিটি গঠন করলেও অধিকাংশ মামলাই বছরের পর বছর আদালতে ঝুলে রয়েছে। ফলে দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হওয়ায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর বার্তা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার সম্মিলিত পরিষদের সভাপতি আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, "কাগজে-কলমে জরিমানা আর মামলা দিয়ে কারসাজি বন্ধ করা সম্ভব নয়। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে বাজার কখনোই স্থিতিশীল হবে না।"

আইনের ফাঁকেই সুবিধা নিচ্ছে কারসাজি চক্র

খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিএসইসির দায়ের করা অনেক মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ও এজাহারে আইনি দুর্বলতা থাকায় অভিযুক্তরা সহজেই উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসেন। ফলে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয় এবং অপরাধীরা কার্যত আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যান।

একটি ব্রোকারেজ হাউসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "যদি কেউ কারসাজি করে ১৫০ কোটি টাকা আয় করে আর জরিমানা হয় মাত্র দুই কোটি টাকা, তাহলে অপরাধ করার প্রবণতা কমবে না, বরং বাড়বে।"

বড় সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতা

বিশ্লেষকদের মতে, গত দেড় দশকে পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল প্রভাবশালী উদ্যোক্তা, করপোরেট পরিচালক এবং বড় ব্রোকারেজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারা।

তাদের দাবি, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিলেও বড় কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে অনেক সময় কেবল সতর্কতামূলক চিঠি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে কমিশন।

আইনে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও প্রয়োগ দুর্বল

সিকিউরিটিজ আইনে কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং ও আর্থিক জালিয়াতির জন্য কারাদণ্ড, বড় অঙ্কের জরিমানা, সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং পুঁজিবাজারে আজীবন নিষেধাজ্ঞার বিধান রয়েছে।

তবে অভিযোগ, এসব আইনি ক্ষমতা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফৌজদারি ব্যবস্থা না নিয়ে প্রশাসনিক জরিমানার পথেই হেঁটেছে বিএসইসি।

সাম্প্রতিক সময়ে বড় জরিমানা

সাম্প্রতিক সময়ে কমিশন আগের বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করেছে।

তথ্য অনুযায়ী, সাবেক সরকারের আমলে সংঘটিত বিভিন্ন কারসাজি ও অনিয়মের ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

এছাড়া—

সালমান এফ রহমানকে ১০০ কোটি টাকা জরিমানা ও আজীবন নিষিদ্ধ।
আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানকে ৫০ কোটি টাকা জরিমানা ও আজীবন নিষিদ্ধ।
সাবেক বিএসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামকে আজীবন নিষিদ্ধ।
সাবেক কমিশনার ড. শামসুদ্দিন আহমেদকে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

তবে বাজারসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, জরিমানা আরোপ হলেও আদায় হচ্ছে কতটা?

আদায় হয়েছে মাত্র ৩৩ লাখ টাকা!

বিএসইসির তথ্যমতে, প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা জরিমানা করা হলেও এখন পর্যন্ত আদায় হয়েছে মাত্র ৩৩ লাখ টাকার মতো।

অভিযোগ, অধিকাংশ অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে রিট বা স্থগিতাদেশ নিয়ে জরিমানা পরিশোধ এড়িয়ে যাচ্ছেন।

বিএসইসি যা বলছে

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, কমিশন ইতোমধ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনালকে আরও কার্যকর করতে নতুন আইনি প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠিয়েছে।

তার মতে, নতুন আইন কার্যকর হলে কমিশন নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরাসরি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে পারবে। এতে বিচার দ্রুত হবে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে জরিমানার আদেশের বিরুদ্ধে আদালতে যেতে হলে অভিযুক্তকে জরিমানার ১৫ শতাংশ অর্থ জমা দিতে হয়। পাশাপাশি বকেয়া জরিমানার ওপর প্রতিদিন অতিরিক্ত অর্থ যোগ হওয়ায় এটি অপরাধীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় হিসেবে কাজ করছে।

আস্থা ফেরাতে প্রয়োজন কঠোর ব্যবস্থা

অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রশাসনিক জরিমানা নয়, দ্রুত বিচার, সম্পদ বাজেয়াপ্ত, কারাদণ্ড এবং কারসাজিকারীদের স্থায়ীভাবে বাজার থেকে বহিষ্কার না করা পর্যন্ত পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরবে না।

তাদের মতে, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!