ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়েছেন জয়পুরহাটের হিমাগার মালিক, আলু ব্যবসায়ী ও কৃষকেরা। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় হিমাগারে সংরক্ষিত বীজ ও খাবার আলু সঠিক তাপমাত্রায় রাখা নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। আলু রক্ষায় বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে হিমাগার মালিকদের। এতে প্রতিদিন বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়, আর সেই অতিরিক্ত খরচের চাপ শেষ পর্যন্ত কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ওপর পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জেলা কৃষি ও হিমাগারসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জয়পুরহাটের চার উপজেলায় মোট ২২টি হিমাগার রয়েছে। এর মধ্যে কালাই উপজেলায় ১৪টি, ক্ষেতলালে চারটি, পাঁচবিবিতে দুটি এবং আক্কেলপুরে দুটি। এসব হিমাগারে বর্তমানে প্রায় ২ লাখ টন বীজ ও খাবার আলু সংরক্ষিত রয়েছে।
আলু দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করতে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি। বিদ্যুৎ সরবরাহে দীর্ঘ সময়ের বিরতি হলে হিমাগারের কুলিং সিস্টেম স্বাভাবিকভাবে চালানো যায় না। এতে তাপমাত্রা বেড়ে আলুতে পচন, অঙ্কুরোদ্গমসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। এ কারণে লোডশেডিং শুরু হলেই অনেক হিমাগারে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালু করতে হচ্ছে।
জেনারেটরের তেলে বাড়তি খরচ হাজার হাজার টাকা
কালাইয়ের পুনট কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপক বিপ্লব কুমার ঘোষ বলেন, তাঁদের হিমাগারে বিভিন্ন কোম্পানির বীজ আলু সংরক্ষিত রয়েছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে আলু রক্ষায় জেনারেটর চালু করতে হয়। তা না হলে হিমাগারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, জেনারেটর চালাতে গিয়ে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হচ্ছে। দীর্ঘ সময় এভাবে চলতে থাকলে হিমাগার পরিচালনায় বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হবে।
একই পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন আক্কেলপুরের গোপীনাথপুর হিমাগার লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী ফরহাদ আহম্মেদ। তাঁর হিমাগারে প্রায় ৬ হাজার টন বীজ ও খাবার আলু সংরক্ষিত রয়েছে।
তিনি বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাভাবিকভাবেই নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আলু যাতে পচে নষ্ট না হয়, সে জন্য বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে ব্যবসায় বাড়তি আর্থিক বোঝা তৈরি হচ্ছে।
পাঁচবিবির চাঁনপাড়া এলাকার মেসার্স সাথী হিমাগার-৩-এর ব্যবস্থাপক রতন কুমার চৌধুরীও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
তাপমাত্রা ঠিক রাখা যাচ্ছে না
ক্ষেতলাল উপজেলার হিমাদ্রী লিমিটেডের ব্যবস্থাপক শরিফুল ইসলাম জানান, তাঁদের হিমাগারে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার বস্তা আলু রয়েছে। এর মধ্যে ৫৬ হাজার বস্তা বীজ আলু এবং বাকি আলু খাবার হিসেবে সংরক্ষিত।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে অনেক সময় হিমাগারের নির্ধারিত তাপমাত্রা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিপুল পরিমাণ আলু পচে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর চালিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন তারা।
আগের লোকসান পুষিয়ে ওঠেননি কৃষকরা
হিমাগারে আলু সংরক্ষণকারীদের দুশ্চিন্তার আরেকটি কারণ বাজারদর। গত মৌসুমের লোকসান এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি অনেক কৃষক। চলতি মৌসুমেও আলুর কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় অনেকেই হিমাগারে আলু রেখে ভবিষ্যতে ভালো দাম পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে আলু নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তাঁদের সেই প্রত্যাশাকেও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
কৃষক চঞ্চল বাবু বলেন, তিনি হিমাগারে ১০০ বস্তা আলু রেখেছেন। বাজারে আলুর দাম কম থাকায় এমনিতেই তিনি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। তার ওপর লোডশেডিংয়ের কারণে আলু নষ্ট হয়ে গেলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
কৃষকদের আশঙ্কা, আলু পচে গেলে শুধু উৎপাদন খরচই উঠবে না, সংরক্ষণের জন্য দেওয়া অর্থও লোকসানে যাবে। একই সঙ্গে বীজ আলু নষ্ট হলে পরবর্তী মৌসুমের চাষাবাদেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
২২ হিমাগারে বড় ঝুঁকি
জয়পুরহাট দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলু উৎপাদন অঞ্চল। জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ আলু উৎপাদনের পর তা সংরক্ষণ করে ধাপে ধাপে বাজারজাত করা হয়। ফলে হিমাগারগুলো শুধু কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য নয়, পুরো স্থানীয় কৃষি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়তো সব ক্ষেত্রে বড় ক্ষতির কারণ নাও হতে পারে। কিন্তু ঘন ঘন ও দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং হলে হিমাগারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি হতে পারে। এতে একদিকে আলুর মান কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, অন্যদিকে পচন শুরু হলে দ্রুত বড় পরিমাণের আলু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ ছাড়া জেনারেটর চালাতে ডিজেল বা অন্যান্য জ্বালানি ব্যবহার করায় হিমাগার মালিকদের পরিচালন ব্যয়ও বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই বাড়তি ব্যয় আলু সংরক্ষণের খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে।
চাহিদা বাড়লে লোডশেডিং বাড়ে: পল্লীবিদ্যুৎ
জয়পুরহাট পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার আবু উমাম মো. মাহবুবুল হক বলেন, প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা একই থাকে না। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়। তখন লোডশেডিং করতে হয়। পাশাপাশি আবহাওয়া বেশি গরম থাকলেও বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার কারণে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে যায়।
তবে তাঁর দাবি, আগের কয়েক দিনের তুলনায় বর্তমানে লোডশেডিং কিছুটা কমে এসেছে।
কৃষি অর্থনীতিতে প্রভাবের আশঙ্কা
হিমাগার মালিক ও কৃষকদের মতে, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আলু সংরক্ষণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বীজ আলু ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু বর্তমান মৌসুমের আর্থিক ক্ষতি নয়, পরবর্তী মৌসুমের উৎপাদন পরিকল্পনাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তাই আলু সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ এ সময়ে হিমাগারগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা গেলে একদিকে কৃষকের সংরক্ষিত আলু নিরাপদ থাকবে, অন্যদিকে হিমাগার মালিকদের অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়ও কমবে।

