বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অথচ সবচেয়ে কম আলোচিত অংশগুলোর একটি হলো অনানুষ্ঠানিক খুচরা অর্থনীতি। দেশের অলিগলি, গ্রাম, বাজার, ফুটপাত কিংবা রাস্তার পাশে ছোট্ট দোকান—এসবই প্রতিদিন লাখো মানুষের জীবিকা এবং কোটি টাকার লেনদেনের কেন্দ্র। অথচ এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঠিক পরিসংখ্যান নেই, নেই কার্যকর নীতিগত কাঠামোও। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের চালু করা ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবস্থা যদি পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে দেশের খুচরা অর্থনীতি প্রথমবারের মতো একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আসতে পারে। এর ফলে সরকারের রাজস্ব আয় যেমন বাড়বে, তেমনি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও পাবেন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, সহজ ঋণ ও নীতিগত সহায়তা।
অনানুষ্ঠানিক খাতেই চলছে বিশাল অর্থনৈতিক কার্যক্রম
দেশজুড়ে মুদি দোকান, সবজি বিক্রেতা, ফল ব্যবসায়ী, হকার, পোশাক বিক্রেতা, ভ্যানচালিত দোকান কিংবা অস্থায়ী স্টল—এসব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে বিশাল একটি খুচরা বাজার। বিভিন্ন গবেষণা ও ব্যবসায়ী সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, কোটিরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে যুক্ত।
যদিও অধিকাংশ ব্যবসার কোনো আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন নেই, তবুও প্রতিদিন এই খাতে বিপুল অঙ্কের নগদ লেনদেন হচ্ছে। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের অবদান উল্লেখযোগ্য হলেও সরকারি হিসাব-নিকাশে সেই অবদান পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না।
বাংলা কিউআর খুলে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার দ্বার
গত ১ জুলাই থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য নিয়ে বাংলা কিউআর (Bangla QR) বাধ্যতামূলক করেছে। একটি মাত্র কিউআর কোড ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য সংরক্ষিত হলে প্রথমবারের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রকৃত বিক্রয়, আয় ও ব্যবসার পরিধি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে। এর মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় আনা সম্ভব হবে।
প্রচুর টার্নওভার, তবুও করজালের বাইরে হাজারো ব্যবসা
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বছরে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা টার্নওভার রয়েছে—এমন দোকানের সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার। আর বছরে ১০ থেকে ৫০ লাখ টাকা বিক্রি হয়—এমন খুচরা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়ে কোটি পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এসব ব্যবসার অনেকেরই ট্রেড লাইসেন্স নেই, আবার যাদের আছে তাদের অনেকেই নিয়মিত নবায়ন করেন না। ভ্যাট ও কর ব্যবস্থাকে জটিল মনে করায় তারা সরকারি ব্যবস্থার বাইরে থেকেই ব্যবসা পরিচালনা করেন।
ক্ষুদ্র পুঁজিতে বড় অর্থনৈতিক অবদান
রাজধানীর মিরপুরের মুদি দোকানদার নূর ইসলাম মাসে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেন। বছরে তার টার্নওভার দাঁড়ায় ৪২ লাখ টাকা। সব ব্যয় বাদ দিয়ে মাসিক আয় থাকে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা।
অন্যদিকে ভাটারার ফল ব্যবসায়ী আনিসুল ইসলাম মাত্র ৭০ হাজার টাকা মূলধন দিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ১০ লাখ টাকার ফল বিক্রি করেন। তার মাসিক নিট মুনাফা প্রায় দেড় লাখ টাকা।
আবার রাজধানীর ফুটপাতে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করে অনেক হকার মাসে ৪০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।
চাঁদাবাজি, ঋণের সংকট ও নীতিগত সহায়তার অভাব
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিদিনের ব্যবসার পাশাপাশি তাদের মোকাবিলা করতে হয় চাঁদাবাজি, উচ্ছেদের ভয়, অনানুষ্ঠানিক ঋণের উচ্চ সুদ, পণ্যের ক্ষয়ক্ষতি এবং নানা প্রশাসনিক জটিলতা।
মিরপুরের এক হকার জানান, কর্মচারীর বেতন, স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাঁদা, লাইনম্যান ও নিরাপত্তা খরচ মিটিয়ে যা থাকে, সেটাই পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস।
বাংলা কিউআর হতে পারে অর্থনীতির গেম চেঞ্জার
অর্থনীতি ও করব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এবং এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মূলধারায় আনতে পাঁচটি বিষয় জরুরি—
ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ
বিনামূল্যে বাংলা কিউআর লেনদেন
সহজ ডিজিটাল ট্রেড লাইসেন্স
ক্যাশ-ফ্লো ভিত্তিক ব্যাংক ঋণ
হলিডে মার্কেট ও ভেন্ডিং জোনতার মতে, এগুলো বাস্তবায়িত হলে লাখো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিতে যুক্ত হতে পারবেন।
করনীতি সহজ না হলে আসবে না ব্যবসায়ীরা
প্রচলিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য উপযোগী নয়। এর পরিবর্তে ১ থেকে ২ শতাংশ ফ্ল্যাট মূসক বা টার্নওভারভিত্তিক কর ব্যবস্থা চালু করা গেলে অনেক ব্যবসায়ী স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর ব্যবস্থায় যুক্ত হবেন।
একই সঙ্গে খাতভিত্তিক লাভের হার নির্ধারণ করে দিলে কর আদায় সহজ হবে এবং কর কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের অপ্রয়োজনীয় বিরোধও কমবে।
সরকারের রাজস্ব বাড়াতে পারে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বর্তমানে অনানুষ্ঠানিক খাতে প্রতিদিন যে পরিমাণ অর্থ লেনদেন হচ্ছে, তার সামান্য অংশও যদি ডিজিটাল ব্যবস্থায় আসে, তাহলে সরকারের রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
এছাড়া ডিজিটাল লেনদেনের তথ্যের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণ, বীমা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগও তৈরি হবে।
বাংলা কিউআরকে ঘিরে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ইতোমধ্যে বিভিন্ন কাঁচাবাজার ও খুচরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে বাংলা কিউআরের ব্যবহার উৎসাহিত করছেন। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু কিউআর চালু করলেই হবে না। এর ব্যবহার সম্পূর্ণ ফি-মুক্ত, সহজ ও ব্যবসাবান্ধব করতে হবে।
একই সঙ্গে ট্রেড লাইসেন্স, কর নিবন্ধন, ক্ষুদ্র ঋণ, ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ ও ব্যবসা সহায়তাকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে পারলে দেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে রূপ নেবে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, বাংলা কিউআর শুধু একটি পেমেন্ট প্রযুক্তি নয়; এটি হতে পারে বাংলাদেশের খুচরা অর্থনীতিকে ডিজিটাল, স্বচ্ছ ও রাজস্বভিত্তিক কাঠামোয় রূপান্তরের অন্যতম বড় হাতিয়ার।

