ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

এনবিআর আন্দোলন দমনে দুদককে ব্যবহার? তালিকায় ১৭ কর্মকর্তা, মেলেনি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রমাণ !

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০২৬, ১১:১৯ এএম

এনবিআর আন্দোলন দমনে দুদককে ব্যবহার? তালিকায় ১৭ কর্মকর্তা, মেলেনি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রমাণ !

ছবিঃ সংগৃহীত

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও  রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে দীর্ঘ আন্দোলনে নামেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আন্দোলন চলাকালে সরকার বিভিন্ন উপায়ে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। সংশ্লিষ্ট একাধিক এনবিআর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তার দাবি, আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে আন্দোলনকারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই দুদককে ব্যবহার করা হয়।

সূত্রগুলো বলছে, আন্দোলনের শেষ দিকে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ২৬ জনের একটি তালিকা দুদকে পাঠানো হয়। পরে দুদক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের সম্পদ অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে ১৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পৃথক অনুসন্ধান শুরু হয়। এর আগে থেকেই আরও একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলমান ছিল। ফলে বর্তমানে মোট ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদের অনুসন্ধান করছে দুদক।

দুদকের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, অনুসন্ধানের আওতায় থাকা সবাই সম্পদের হিসাব দাখিল করেছেন। এসব তথ্য-উপাত্ত এখনো যাচাই-বাছাই পর্যায়ে রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে কমিশনার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তদবির করা হয়েছে বলেও সূত্রটি দাবি করেছে।

দুদক কর্মকর্তারা জানান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয়কর নথির সঙ্গে সম্পদের তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আয়কর বিবরণীতে প্রদর্শিত হয়নি—এমন সম্পদের খোঁজেও সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। অনুসন্ধানের প্রয়োজনে কয়েকজনের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়েছে। প্রয়োজনে তাদের স্বজনদের সম্পদের হিসাবও তলব করা হতে পারে।

যাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে

দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছেন এনবিআরের সাবেক সদস্য (কর জরিপ ও পরিদর্শন) এম এম ফজলুল হক, সাবেক সদস্য (কর লিগ্যাল অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) এ কে এম বদিউল আলম, সাবেক সদস্য (আন্তর্জাতিক কর) মো. লুৎফুল আজীম, সাবেক সদস্য (কর অডিট, ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন) মো. আলমগীর হোসেন, কাস্টমস কমিশনার কাজী মুহাম্মদ জিয়া উদ্দিন, কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালের সদস্য (টেকনিক্যাল) মো. কামরুজ্জামান, অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল রশিদ মিয়া, হাছান তারেক রিকাবদার ও সাধন কুমার কুণ্ডু, অতিরিক্ত কর কমিশনার মো. মামুন মিয়া, মির্জা আশিক রানা ও সেহেলা সিদ্দিকা, যুগ্ম কর কমিশনার মোহাম্মদ মোরশেদ উদ্দিন খান, কাস্টমস ও ভ্যাটের যুগ্ম কমিশনার (প্রথম সচিব) তারেক হাসান, উপ-কর কমিশনার মোহাম্মদ শিহাবুল ইসলাম ও মোনালিসা শাহরীন সুস্মিতা, এবং আয়কর কর্মচারী লোকমান আহমেদ।

তাদের মধ্যে এ কে এম বদিউল আলম, এম এম ফজলুল হক, মো. লুৎফুল আজীম ও আব্দুল রশিদ মিয়াসহ কয়েকজনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন আদালত।

আন্দোলনের সূত্রপাত

এনবিআর ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) বিলুপ্ত করে ‍‍`রাজস্ব নীতি বিভাগ‍‍` এবং ‍‍`রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ‍‍` গঠনের লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ১২ মে অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। এর পর থেকেই আন্দোলনে নামেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

তাদের অভিযোগ, এনবিআর সংস্কারের জন্য গঠিত পরামর্শক কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করে সরকার খসড়া অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে। এ কারণে এনবিআরে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। কাস্টমস অ্যাসোসিয়েশন ও ট্যাকসেশন অ্যাসোসিয়েশন পৃথকভাবে বিবৃতি দিয়ে সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়।

‍‍`পরামর্শক কমিটির সুপারিশ মানা হয়নি‍‍`

২০২৫ সালের ৩ মে ট্যাকসেশন অ্যাসোসিয়েশনের বিশেষ সাধারণ সভায় বক্তারা দাবি করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শ্বেতপত্র কমিটির সঙ্গে আলোচনায় তারা এনবিআরের সামগ্রিক সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মডেল হিসেবে যুক্তরাজ্যের রাজস্ব প্রশাসনের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছিল। পরে গঠিত এনবিআর সংস্কার পরামর্শক কমিটিও একই ধরনের সুপারিশ করে এবং বিশ্বব্যাংকও তাতে সম্মতি দেয় বলে তাদের দাবি।

তাদের অভিযোগ, শেষ পর্যন্ত সেই সুপারিশ উপেক্ষা করে দুটি পৃথক বিভাগভিত্তিক মডেল গ্রহণ করা হয়। এতে কর ও কাস্টমস ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

‍‍`এনবিআরকে বিভাগ নয়, স্বশাসিত সংস্থার মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব ছিল‍‍`

বক্তারা জানান, ৫ জানুয়ারি দুই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে অর্থ উপদেষ্টার কাছে একটি বিকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়। সেখানে এনবিআরকে বিভাগের মর্যাদাসম্পন্ন স্বশাসিত রাজস্ব সংস্থা হিসেবে রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে চেয়ারম্যানকে সিনিয়র সচিবের মর্যাদা দিয়ে সরাসরি অর্থমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহির ব্যবস্থার কথা বলা হয়।

এছাড়া রাজস্ব নীতি প্রণয়নের জন্য আলাদা পলিসি উইং বা থিংক-ট্যাংক গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যেখানে প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের পরিবর্তে নীতিনির্ধারণমূলক বিশেষজ্ঞরা কাজ করবেন।

‍‍`খসড়া অধ্যাদেশে শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন‍

অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের ভাষ্য, ৬ মার্চ তারা যে খসড়া দেখেছিলেন, সেখানে দুটি বিভাগেই কর ও কাস্টমস ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সচিব পর্যন্ত পদে নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছিল। কিন্তু ১১ মার্চ উপদেষ্টা পরিষদে পাঠানো সংশোধিত খসড়ায় সেই বিধান বাদ দেওয়া হয়।

তাদের দাবি, এই পরিবর্তনের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কিছুই জানানো হয়নি। এতে কার্যত এনবিআরের বিদ্যমান কাঠামো ভেঙে প্রশাসন ক্যাডারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়েছে।

‍‍`বিভাগ নয়, রাজস্ব আদায় করে স্বশাসিত সংস্থা‍‍`

অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা আরও বলেন, রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী কোনো বিভাগ সরাসরি এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না; এ ধরনের ক্ষমতা থাকে স্বশাসিত সংস্থা বা এজেন্সির। অথচ রাজস্ব প্রশাসনের অংশ হিসেবে ব্যাংক হিসাব অনুসন্ধান, প্রমাণ জব্দ, তদন্ত এবং আইন প্রয়োগের মতো ক্ষমতা এনবিআরের রয়েছে।

তাদের দাবি, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত স্বশাসিত সংস্থা হিসেবে পরিচালিত হয়; মন্ত্রণালয়ের সাধারণ বিভাগ হিসেবে নয়। তাই দুটি বিভাগভিত্তিক নতুন কাঠামো রাজস্ব প্রশাসনের কার্যকারিতা ও স্বাধীনতা—উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!