দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু, বাড়ছে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। একই সঙ্গে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম—দুই হিসাব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯২৮ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৯১ জন। পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ১৮ হাজার ২০৮ জনের। শুধু গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও ৯৪০ শিশু। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৮৭৬ জন এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম নিয়ে ৬৪ জন।
প্রতিদিনই হাসপাতালে সহস্রাধিক রোগী
স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হামের প্রাদুর্ভাব দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। অনেক শিশুকে জ্বর, সর্দি-কাশি ও শরীরে র্যাশ নিয়ে হাসপাতালে আনা হলেও পরবর্তী সময়ে তাদের কারও কারও শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা কিংবা অপুষ্টিজনিত জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকার অনেক শিশু রোগের শুরুতে চিকিৎসা না পেয়ে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছাচ্ছে। ফলে চিকিৎসা শুরু হওয়ার পরও তাদের অনেককে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম সাধারণত প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। নিয়মিত ও সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা গেলে এর সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকি ব্যাপকভাবে কমানো সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘদিন নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি, টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশু, অসম্পূর্ণ টিকাপ্রাপ্তির হার, অপুষ্টি এবং স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য—সব মিলিয়ে এবারের পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে।
শূন্য-ডোজ শিশুদের শনাক্তে জোর দেওয়ার পরামর্শ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের শনাক্ত করা।
তার ভাষ্য, শূন্য-ডোজ ও অসম্পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের তালিকা তৈরি করে দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে। যেসব এলাকায় সংক্রমণের হার বেশি, সেখানে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোতে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত শয্যা, অক্সিজেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং পুষ্টি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে জটিল রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে উন্নত চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে।
গণটিকার পরও কেন সংক্রমণ থামছে না?
হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকার জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি হাতে নেয়। এতে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। জুনের হিসাব অনুযায়ী, ১ কোটি ৮৪ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। অর্থাৎ কাগজে-কলমে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১০২ শতাংশ কভারেজ অর্জনের দাবি করা হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গত জুনের শেষ দিকে ভিটামিন এ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিশুর তুলনায় হাম-রুবেলা টিকা পাওয়া শিশুর সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ কম ছিল। ফলে জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের কভারেজ বেশি দেখালেও বিপুলসংখ্যক শিশু বাস্তবে টিকার বাইরে থেকে গেছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক হাম পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৪-২৫ সালে এমআর টিকার সরবরাহ ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে দুর্বলতা এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি না হওয়া।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা
হামের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে ছোট শিশুরা। ডব্লিউএইচওর প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রাদুর্ভাবের প্রথম দিকে আক্রান্তদের প্রায় ৭৯ শতাংশের বয়স ছিল পাঁচ বছরের নিচে। এর মধ্যে দুই বছরের কম বয়সী শিশুর অংশ ছিল প্রায় ৬৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় হাম দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা এবং টিকা না পাওয়া শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
হাম থেকে নিউমোনিয়া, তীব্র শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতা ও মস্তিষ্কে প্রদাহসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এসব জটিলতা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
অপুষ্টি ও দেরিতে চিকিৎসা বাড়াচ্ছে মৃত্যুঝুঁকি
হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুদের একটি বড় অংশের ক্ষেত্রে অপুষ্টি ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার বিষয়টি সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, হাম আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুদের প্রায় ৮২ শতাংশ জীবনের প্রথম ছয় মাস একচেটিয়া বুকের দুধ পায়নি। তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এটি প্রতিটি মৃত্যুর সরাসরি কারণ প্রমাণ করে না; বরং শিশুর পুষ্টি ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছানো অনেক শিশুর অবস্থা ভর্তি হওয়ার পর দ্রুত অবনতি ঘটে। কারও কারও ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তির ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু হচ্ছে।
টিকার পাশাপাশি দরকার পুষ্টি ও দ্রুত চিকিৎসা
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও আইসিডিডিআর,বির যৌথ গবেষণায় ৩৫৪ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, টিকা নেওয়ার উপযুক্ত বয়সে পৌঁছেও হাম টিকা না পাওয়া শিশুদের ৯৭ শতাংশের পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে। এক ডোজ টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যেও ৯২ শতাংশের পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু গণটিকা কর্মসূচি চালু করলেই দীর্ঘমেয়াদে হামের বিস্তার বন্ধ করা সম্ভব হবে না। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী করা, শূন্য-ডোজ শিশু শনাক্ত করা, টিকার দ্বিতীয় ডোজ নিশ্চিত করা, অপুষ্টি কমানো এবং দ্রুত রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা—সবগুলো উদ্যোগ একসঙ্গে চালাতে হবে।
আরও দুই-তিন মাস থাকতে পারে প্রাদুর্ভাব
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে।
এ অবস্থায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। যেসব এলাকায় টিকাদানের হার কম এবং অপুষ্ট শিশুর সংখ্যা বেশি, সেসব এলাকায় বিশেষ নজরদারি, বাড়ি বাড়ি টিকাদান যাচাই এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ, হাম প্রতিরোধযোগ্য হলেও টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের সংখ্যা যতদিন থাকবে, ততদিন সংক্রমণের ঝুঁকিও থাকবে। আর অপুষ্টি ও চিকিৎসা পেতে দেরি হলে একটি সাধারণ সংক্রমণও পরিণত হতে পারে শিশুর জন্য প্রাণঘাতী জটিলতায়।

