বছরের প্রথম সাত মাসেই দেশে হামে আক্রান্ত হয়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে উঠলেও চিকিৎসকরা বলছেন, তাদের বড় একটি অংশ এখনো ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। কারণ, হাম থেকে সেরে ওঠার পর অনেকের শরীরে দেখা দিচ্ছে ‘ইমিউনিটি অ্যামনেশিয়া’ (Immune Amnesia)। এর ফলে শরীরের পূর্বের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার একটি বড় অংশ দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। আর সেই সুযোগেই ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন ভাইরাস সহজেই শরীরে আক্রমণ করছে।
এদিকে বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হামে দুর্বল হয়ে পড়া শরীরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ডেঙ্গু ভাইরাসের নতুন সেরোটাইপের বিস্তার এবং দেশের স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা। সব মিলিয়ে দেশে ডেঙ্গু ও হামের সম্মিলিত প্রভাব এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।
ডেঙ্গুতে মৃত্যুহারে উদ্বেগজনক অবস্থানে বাংলাদেশ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তের সংখ্যায় বাংলাদেশ শীর্ষে না থাকলেও ডেঙ্গুতে মৃত্যুহারে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবস্থানে রয়েছে।
চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১৫ হাজার ১৫৩ জন, মারা গেছেন ৫৩ জন। একই সময়ে শ্রীলঙ্কায় প্রায় ৭৬ হাজার মানুষ আক্রান্ত হলেও মৃত্যু হয়েছে ৫৭ জনের।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী—
বাংলাদেশে মৃত্যুহার: ০.৪৯ শতাংশ
ভারতে: ০.০৮ শতাংশ
শ্রীলঙ্কায়: ০.০৬ শতাংশ
পাকিস্তানে: ০.০৫ শতাংশ
এছাড়া বিশ্বব্যাপী আক্রান্তের সংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও সেখানে মৃত্যুহার বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম।
হামের পর কেন বাড়ছে ডেঙ্গুর ঝুঁকি?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের ভাইরাস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এমনভাবে দুর্বল করে দেয়, যা ‘ইমিউনিটি অ্যামনেশিয়া’ নামে পরিচিত। এতে শরীর পূর্বে অর্জিত অনেক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
ফলে হাম থেকে সুস্থ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া কিংবা অন্যান্য ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে হাম ও ডেঙ্গুর এই যুগপৎ পরিস্থিতি শিশু, বয়স্ক এবং দুর্বল রোগীদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু
একসময় ডেঙ্গু মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী।
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত বাড়ছে—
বরিশাল বিভাগ,চট্টগ্রাম বিভাগ, খুলনা বিভাগ অন্যদিকে ময়মনসিংহ বিভাগে আক্রান্ত তুলনামূলক কম হলেও মৃত্যুহার উদ্বেগজনক। লার্ভা বেশি, অভিযান কম
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ঢাকার বাইরে এখন এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব অনেক বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
তার মতে, বর্ষাকেন্দ্রিক নয়, বছরজুড়ে বৈজ্ঞানিকভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, সরকার নিয়মিত বৈঠকে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিলেও বাস্তবে সেগুলোর অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয় না।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেন বলেন,
"শুধু বর্ষাকালে অভিযান চালিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বছরজুড়ে মশার উৎস ধ্বংস করতে হবে। কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত না করলে এই সংকট থেকে বের হওয়া কঠিন হবে।"
চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও বাড়াচ্ছে মৃত্যু
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর নতুন সেরোটাইপ, সময়মতো রোগ শনাক্ত না হওয়া এবং জেলা পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসার সীমাবদ্ধতার কারণেও মৃত্যুহার বাড়ছে।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, দেশের ঘনবসতি, উপকূলীয় আবহাওয়া, মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ, পুষ্টিহীনতা এবং দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতাও পরিস্থিতিকে জটিল করছে।
জনস্বাস্থ্যবিদদের সুপারিশ
বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন—
বছরব্যাপী এডিস মশা নিধন অভিযান পরিচালনা।
আক্রান্ত এলাকা শনাক্ত করে দ্রুত উৎস ধ্বংস।
কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ বাস্তবায়ন।
জেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধি।
জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
সামনের দিন আরও কঠিন হতে পারে
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, হাম-পরবর্তী দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ডেঙ্গুর নতুন ধরন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আগামী কয়েক মাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
তাদের মতে, ডেঙ্গু এখন আর শুধু মৌসুমি রোগ নয়; এটি একটি বছরব্যাপী জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট, যা মোকাবিলায় সমন্বিত, বৈজ্ঞানিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।

