দেশে সেপ্টেম্বর থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতাল ও চিকিৎসাব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত রোগ শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে (বিএমইউ) আয়োজিত ‘ডেঙ্গু ২০২৬: আপডেটস অন ইমার্জিং চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট’ শীর্ষক ইউনিভার্সিটি সেন্ট্রাল সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। বিএমইউর এ ব্লক অডিটোরিয়ামে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল সেমিনার সাব-কমিটির উদ্যোগে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে ডেঙ্গুর পরিবর্তিত পরিস্থিতি, রোগের নতুন চ্যালেঞ্জ, বিভিন্ন জটিলতা, রোগ শনাক্তকরণ এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ রোগী দ্রুত শনাক্ত করে সময়মতো চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি হাসপাতাল পর্যায়ে সমন্বিত প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বাড়তে পারে ঝুঁকি
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী বলেন, দেশে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও ডিসেম্বর মাসে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আরও বাড়তে পারে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলা কেবল হাসপাতাল বা চিকিৎসকদের দায়িত্ব নয়। রোগের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।
উপাচার্য বলেন, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা এবং বাড়ি ও আশপাশের জমে থাকা পানি অপসারণে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।
দ্রুত রোগ শনাক্তকরণে গুরুত্ব
বিএমইউর উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেরিতে রোগ নির্ণয় হলে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে পারে এবং জটিলতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
তিনি দ্রুত রোগ শনাক্তকরণের পাশাপাশি রোগীর অবস্থা অনুযায়ী যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের দ্রুত চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতায় আনার বিষয়ে চিকিৎসকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
সেরোটাইপ ও রোগের তীব্রতা নিয়ে আলোচনা
সেমিনারে বাংলাদেশের ডেঙ্গুর পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে বৈজ্ঞানিক আলোচনা করা হয়। বিশেষ করে ডেঙ্গু ভাইরাসের বিভিন্ন সেরোটাইপের পরিবর্তনশীল প্রবণতা এবং এর সঙ্গে রোগের তীব্রতার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন বিশেষজ্ঞরা।
‘দ্য চেঞ্জিং ল্যান্ডস্কেপ অব ডেঙ্গু ইন বাংলাদেশ: সেরোটাইপ ডাইনামিকস অ্যান্ড ডিজিজ সিভিয়ারিটি’ শীর্ষক বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএমইউর ভাইরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এস এম রাশেদ উল ইসলাম।
এ ছাড়া ‘আপডেটেড ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট অব ডেঙ্গু’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক খালেদ মাহবুব মুর্শেদ। তাঁদের উপস্থাপনায় ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় বর্তমান ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনা, রোগীর ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
শুধু হাসপাতাল প্রস্তুত রাখলেই হবে না
বক্তারা বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও বাড়তে পারে। এ কারণে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখতে হবে। তবে শুধু হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়িয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, বাসাবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং জমে থাকা পানি অপসারণের মতো প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম নিয়মিত চালানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।
তাঁদের মতে, রোগী হাসপাতালে আসার পর চিকিৎসার পাশাপাশি রোগের বিস্তার ঠেকাতে স্থানীয় পর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ও জনসচেতনতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকদের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের তাগিদ
সেমিনারে ডেঙ্গুর জটিল রোগীদের দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে হাসপাতাল পর্যায়ে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। রোগীর শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন দ্রুত পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ রোগী শনাক্ত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বক্তারা বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আগেই চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং হাসপাতালের সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ডেঙ্গুর লক্ষণ, ঝুঁকি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও সেন্ট্রাল সেমিনার সাব-কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আফজালুন নেছার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিএমইউর উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. আবুল কালাম আজাদ, উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক নাহরীন আখতার এবং রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. মোস্তফা কামালসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারের আলোচনায় সামগ্রিকভাবে উঠে আসে—ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা নয়, বরং আগাম প্রস্তুতি, দ্রুত শনাক্তকরণ, কার্যকর চিকিৎসা, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জনসম্পৃক্ততা—এই সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বাস্তবায়ন করলেই সম্ভাব্য বাড়তি চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব।

