ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

menu

সয়াবিন তেলে ভয়ংকর মাইক্রোপ্লাস্টিক: গবেষণায় মিলল ৬ ধরনের প্লাস্টিক, খোলা তেলে ঝুঁকি বেশি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুলাই ২৯, ২০২৬, ১১:০০ এএম

সয়াবিন তেলে ভয়ংকর মাইক্রোপ্লাস্টিক: গবেষণায় মিলল ৬ ধরনের প্লাস্টিক, খোলা তেলে ঝুঁকি বেশি

ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া সয়াবিন তেলে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা খোলা ও বোতলজাত সয়াবিন তেলের প্রতিটি নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব নমুনায় ৬ ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে পলিইউরেথেন (Polyurethane) ও নাইলন (Nylon)-এর উপস্থিতি ভোজ্যতেলে এই প্রথমবারের মতো শনাক্ত হওয়ার দাবি করেছেন গবেষকেরা।

গবেষণাটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাময়িকী Journal of Food Composition and Analysis-এর ২০২৬ সালের এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু খাদ্য নিরাপত্তার নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকির ক্ষেত্রেও নতুন করে সতর্কবার্তা দিচ্ছে।

৬ ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত

গবেষণায় সয়াবিন তেলের নমুনায় যে ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমার পাওয়া গেছে, সেগুলো হলো—

লো-ডেনসিটি পলিইথিলিন (LDPE)
হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন (HDPE)
পলিপ্রোপিলিন (PP)
পলিইথিলিন টেরেফথালেট (PET)
পলিইউরেথেন (Polyurethane)
নাইলন (Nylon)

এসব পলিমারের মধ্যে এলডিপিই, এইচডিপিই, পিপি ও পিইটি সাধারণত প্লাস্টিক বোতল, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ পাত্র, মোড়ক ও শিল্পকারখানার বিভিন্ন উপকরণ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

অন্যদিকে পলিইউরেথেন ও নাইলনের উপস্থিতি গবেষকদের বিশেষভাবে বিস্মিত করেছে। তাদের মতে, উৎপাদন কারখানার যন্ত্রপাতি, ফিল্টার, সিলিং উপকরণ কিংবা প্যাকেজিং ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপ থেকে এসব প্লাস্টিক কণা তেলের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। তবে কোন নির্দিষ্ট ধাপে এগুলো যুক্ত হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রতি লিটারে ৫৩ হাজারের বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক

গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা খোলা ও বোতলজাত সয়াবিন তেলের মোট ৬০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

পরীক্ষায় দেখা যায়, প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে।

এছাড়া শনাক্ত হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের ৮২ দশমিক ৫ শতাংশই ছিল তন্তু (Fiber) আকৃতির। বাকি অংশে ছিল—

খণ্ডিত কণা (Fragment)
ফিল্ম (Film)
ফোম (Foam)
পেলেট (Pellet)
বিড (Bead)

গবেষকদের মতে, তন্তু আকৃতির প্লাস্টিক সাধারণত বস্ত্র, শিল্পকারখানা, প্যাকেজিং ও পরিবেশগত দূষণ থেকে খাদ্যে প্রবেশ করতে পারে।

খোলা তেলে ঝুঁকি বেশি

গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, বোতলজাত বা ব্র্যান্ডেড তেলের তুলনায় খোলা ও ব্র্যান্ডবিহীন তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ বেশি পাওয়া গেছে।

গবেষকদের ধারণা, এর পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করতে পারে—

পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পাত্রে তেল সংরক্ষণ
দীর্ঘ সময় খোলা অবস্থায় তেল বিক্রি
অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যবিধি
পরিবহন ও সংরক্ষণের অনিয়ম
আশপাশের শিল্পকারখানার পরিবেশগত দূষণ

তবে গবেষণায় এটিও স্পষ্ট হয়েছে যে, বোতলজাত তেলও সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। কারণ ব্র্যান্ডেড তেলের প্রতিটি নমুনাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।

এতে ধারণা করা হচ্ছে, উৎপাদন, পরিশোধন, প্যাকেজিং অথবা পরিবহনের কোনো পর্যায়ে প্লাস্টিকের অতিক্ষুদ্র কণা তেলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

কেন বাড়ছে উদ্বেগ?

বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাদ্য, পানীয়, সমুদ্রের মাছ, লবণ, মধু এমনকি মানুষের রক্ত ও বিভিন্ন অঙ্গেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এবার ভোজ্যতেলে এমন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক কণা পাওয়া যাওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক চোখে দেখা যায় না। কিন্তু এগুলো দীর্ঘদিন খাদ্যের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করলে কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে, সে বিষয়ে এখনো গবেষণা চলছে।

বর্তমান গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হলেও এগুলো সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট রোগের কারণ—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহে এসব প্লাস্টিক কণার প্রভাব জানতে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দিয়েছেন গবেষকেরা।

মান নিয়ন্ত্রণে জোর দেওয়ার আহ্বান

গবেষকরা মনে করছেন, ভোজ্যতেল উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি।

তাদের সুপারিশ অনুযায়ী—

উৎপাদন ও পরিশোধন কারখানায় আধুনিক মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
প্যাকেজিং উপকরণের গুণগত মান নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।
খোলা তেল বিক্রির ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।
খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গবেষণায় আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।

বিশ্লেষকদের মতে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন শুধু ভেজাল প্রতিরোধই যথেষ্ট নয়; বরং মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলাও জাতীয় অগ্রাধিকারে আনতে হবে। কারণ খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

banner
Link copied!