ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

“হামের ছোবলে থেমে গেল সাড়ে পাঁচ মাসের সাইফানের জীবন”

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ২২, ২০২৬, ০৯:৪১ এএম

“হামের ছোবলে থেমে গেল সাড়ে পাঁচ মাসের সাইফানের জীবন”

ছবিঃ সংগৃহীত

যে বয়সে মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে আর বাবার বুকে মাথা রেখে পৃথিবীকে চিনতে শেখার কথা, সেই বয়সেই হাসপাতালের আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর কঠিন লড়াই করতে হয়েছে সাড়ে পাঁচ মাসের শিশু মোহাম্মদ সাইফানকে। হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। একপর্যায়ে পরপর দুবার খিঁচুনি, মস্তিষ্কে জটিলতা ও হৃদযন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে সমস্যা দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত লাইফ সাপোর্টেও রাখা হয় তাকে।

কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাতে ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা গেছে সাইফান। তার মৃত্যুতে বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হারানোর শোক নেমে এসেছে পরিবারজুড়ে।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) ফেনী সদর উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়নের মাদরাসা রোডের ওয়াজ পাটোয়ারী বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

হামের উপসর্গ থেকে শুরু, পরে বাড়তে থাকে জটিলতা

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ আগস্ট সকালে হঠাৎ সাইফানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। এর আগে তার শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। স্থানীয় চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তখন তার চিকিৎসা চলছিল।

শরীরে লালচে দানা ওঠার পর কয়েকদিন চিকিৎসা নেওয়ায় তার শারীরিক অবস্থায় কিছুটা উন্নতিও দেখা দিয়েছিল। পরিবারের সদস্যরা তখন আশাবাদী ছিলেন, দ্রুতই সুস্থ হয়ে উঠবে ছোট্ট সাইফান।

কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। হঠাৎ করে আবার তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ফেনীর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকদের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা অথবা চট্টগ্রামে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

এরপর সাইফানকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

১৩ দিন আইসিইউতে, শেষ পর্যন্ত লাইফ সাপোর্ট

সাইফানের বাবা মোহাম্মদ কাওছার জানান, হামের উপসর্গ নিয়ে ছেলেকে ঢাকায় নিয়ে মহাখালীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন তারা।

সেখানে চিকিৎসা চললেও প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। একপর্যায়ে পরপর দুবার খিঁচুনি হয় সাইফানের। এরপর তার মস্তিষ্কে জটিলতা দেখা দেয়। পাশাপাশি হৃদযন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও নানা সমস্যা তৈরি হয়।

টানা ১৩ দিন হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল সাইফান। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে শেষ দিকে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।

পরিবারের সদস্যরা তখনও আশা ছাড়েননি। চিকিৎসকদের প্রচেষ্টা এবং সন্তানের ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন-রাত হাসপাতালেই কাটিয়েছেন বাবা-মা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে মর্মান্তিকভাবে।

গত বুধবার (২০ আগস্ট) রাতে সাইফানকে ঢাকার আরেকটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর তার মৃত্যু হয়।

‘আমার সন্তানের মতো আর কোনো শিশু যেন এভাবে না হারায়’

একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন সাইফানের বাবা মোহাম্মদ কাওছার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, হামের উপসর্গ নিয়ে ছেলেকে ঢাকায় নিয়ে মহাখালীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। সেখানে চিকিৎসা চললেও তার অবস্থার উন্নতি হয়নি। তিনি বলেন, একপর্যায়ে পরপর দুবার খিঁচুনি হলে সাইফানের মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে হৃদযন্ত্রের জটিলতাসহ শরীরে আরও নানা সমস্যা দেখা দেয়। টানা ১৩ দিন আইসিইউতে থাকার পর শেষ দিকে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল।

কাওছার বলেন, ‘আমার সন্তানের মতো আর কোনো শিশু যেন হামে আক্রান্ত হয়ে এভাবে প্রাণ না হারায়। এ জন্য পরিবার থেকে শুরু করে সরকার—সবাইকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে।’

সাড়ে পাঁচ মাসের সন্তান হারিয়ে শোকাহত পরিবার

সাইফানের জন্ম চলতি বছরের ৪ মার্চ। সে ছিল মোহাম্মদ কাওছার ও ফোজিয়া আক্তার ইভার প্রথম সন্তান। মাত্র সাড়ে পাঁচ মাসের মাথায় একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে নির্বাক হয়ে পড়েছেন তারা।

সাইফানের বাবা স্থানীয় গণমাধ্যম দৈনিক ফেনীর চিত্রের সাংবাদিক এবং ড্রিম আর্টিসান নামে একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী।

পরিবারের কাছে সাইফান ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পাওয়া প্রথম সন্তান। মাত্র কয়েক মাসের এই ছোট্ট জীবনে সে পরিবারের সবার ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। তার অসুস্থতার পর সুস্থতার জন্য স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাও প্রার্থনা করছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেল শিশুটি।

টিকাদান নিয়ে নতুন করে সচেতনতার প্রশ্ন

সাইফানের বয়স ছিল পাঁচ মাসের কিছু বেশি। অর্থাৎ নিয়মিত টিকাদান সূচিতে হামের টিকা নেওয়ার নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই সে অসুস্থ হয়ে পড়ে বলে পরিবার জানিয়েছে।

শিশুটির মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়; একই সঙ্গে হাম ও টিকাদান নিয়ে অভিভাবকদের সচেতনতা, শিশুর অসুস্থতার প্রাথমিক পর্যায়ে দ্রুত চিকিৎসা এবং জটিলতা দেখা দিলে সময়মতো উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়টিও সামনে নিয়ে এসেছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, শিশুদের টিকাদান সূচি যথাযথভাবে অনুসরণ করা এবং হামসহ সংক্রামক রোগের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশুর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে দেরি না করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করাও জরুরি।

সাইফানের চলে যাওয়া তার বাবা-মায়ের জীবনে তৈরি করেছে অপূরণীয় শূন্যতা। যে শিশুটিকে ঘিরে ছিল একটি পরিবারের অসংখ্য স্বপ্ন, মাত্র সাড়ে পাঁচ মাসের জীবন শেষে সেই স্বপ্ন এখন পরিণত হয়েছে স্মৃতিতে।

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!