ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার: ২৫ হাজার ছাড়াল আক্রান্ত, মৃত্যু ৭৪—সামনে আরও কঠিন সময়ের শঙ্কা

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: আগস্ট ১৯, ২০২৬, ১০:৩৯ এএম

ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার: ২৫ হাজার ছাড়াল আক্রান্ত, মৃত্যু ৭৪—সামনে আরও কঠিন সময়ের শঙ্কা

ছবিঃ সংগৃহীত

সারাদেশে দ্রুত বাড়ছে প্রাণঘাতী ডেঙ্গুর প্রকোপ। চলতি বছর এরই মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়েছে। সরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা পৌঁছেছে ৭৪ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৫৩ জন ডেঙ্গু রোগী।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নতুন আক্রান্তসহ চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৬০১ জনে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১ হাজার ৭৮০ জন।

চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা সম্ভব হলেও পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে বর্ষাকালে এডিস মশার প্রজননস্থল দ্রুত বাড়তে থাকায় আগামী সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরসহ পরবর্তী মাসগুলোতে সংক্রমণ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু হাসপাতাল ও চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করলেই হবে না। একই সঙ্গে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।

জ্বর কমলেই বিপদ কাটে না

ডেঙ্গু চিকিৎসায় সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো জ্বর কমে যাওয়ার পর রোগী সুস্থ হয়ে গেছেন—এমন ধারণা করা। চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর কমার সময়টিই অনেক সময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়।

জ্বর কমে যাওয়ার পর রোগীর শরীর থেকে প্লাজমা বেরিয়ে যেতে পারে। এতে রক্তচাপ দ্রুত কমে গিয়ে শক তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়া কিংবা অন্যান্য গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।

কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. কবিরুল বাশার বলেন, তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, শরীরের কোনো স্থান থেকে রক্তক্ষরণ, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব—এসব সতর্ক সংকেতের কোনো একটি দেখা দিলেই দেরি না করে রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে।

তার মতে, ডেঙ্গুর গুরুতর পর্যায়ে দ্রুত সঠিক চিকিৎসা শুরু করা গেলে অনেক রোগীকেই সুস্থ করে তোলা সম্ভব। কিন্তু হাসপাতালে যেতে দেরি হলে জটিলতা দ্রুত বাড়তে পারে এবং মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়।

আক্রান্ত ২৫ হাজার, হাসপাতালে ১ হাজার ৭৮০

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৫৩ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ২৯২ জন, বরিশালে ৯৮, চট্টগ্রামে ৯৪, খুলনায় ১৩৫, ময়মনসিংহে ৬১, রাজশাহীতে ৪৬, রংপুরে ২৪ এবং সিলেটে তিনজন ভর্তি হয়েছেন।

নতুন আক্রান্তদের পাশাপাশি একই সময়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪ জনে।

এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত ২৫ হাজার ৬০১ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১ হাজার ৭৮০ জন।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি পরিসংখ্যানে মূলত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের তথ্যই প্রতিফলিত হয়। অনেক রোগী হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নেন। ফলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জুলাইয়ে ৩৬, আগস্টেই মৃত্যু ২০

মাসভিত্তিক হিসাবেও ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। বিদায়ী জুলাই মাসে ডেঙ্গুতে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়েই মারা গেছেন আরও ২০ জন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্ষাকালে এডিস মশার প্রজনন পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় সামনে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

বিশেষ করে থেমে থেমে বৃষ্টি, বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি এবং উচ্চ আর্দ্রতা এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আগস্ট-পরবর্তী সময়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বাড়তে পারে প্রকোপ

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) ‘ডেঙ্গুর পরিবর্তিত পরিস্থিতি, নতুন চ্যালেঞ্জ এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক বৈজ্ঞানিক সেমিনারেও সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

সেমিনারে বিএমইউ উপাচার্য ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও ডিসেম্বর মাসে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিএমইউ রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।

তার মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু চিকিৎসক ও হাসপাতালের প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। সিটি করপোরেশন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

রোগ শনাক্তে দেরি নয়

সেমিনারে বিএমইউর উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) ডা. মো. নজরুল ইসলাম রোগ দ্রুত শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

তার মতে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগ শনাক্তে দেরি হলে রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে। তাই রোগের শুরুতেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বর হলেই ডেঙ্গু—এমন নয়; আবার জ্বর কমে গেলেই ডেঙ্গু থেকে ঝুঁকি শেষ—এমন ধারণাও বিপজ্জনক। রোগীর শারীরিক অবস্থা, রক্তের বিভিন্ন সূচক এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যেতে হয়।

ঢাকা ও খুলনায় প্রাণহানি বেশি

চলতি বছর ভৌগোলিকভাবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং খুলনা বিভাগে—উভয় জায়গাতেই ২৪ জন করে মারা গেছেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় মারা গেছেন আরও নয়জন।

এতে স্পষ্ট যে ডেঙ্গু এখন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহর ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে জমে থাকা পানি, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রেন ও বিভিন্ন স্থাপনায় পানি জমে এডিসের প্রজননস্থল তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

‘মূল লড়াই মশার উৎসে’

ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার ওপর জোর দিয়েছেন ড. কবিরুল বাশার।

তার মতে, বাড়ির ছাদ, গাড়ি পার্কিং, ভবনের বেসমেন্ট, বারান্দা, ফুলের টব, এসি ও ফ্রিজের ট্রে, প্লাস্টিকের ড্রাম, পরিত্যক্ত টায়ার কিংবা অন্য কোনো পাত্রে পানি জমতে দেওয়া যাবে না।

তিনি মনে করেন, শুধু ব্যক্তিগতভাবে মশা নিধন করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। পরিবার, প্রতিবেশী, আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থল—সব জায়গায় একযোগে প্রজননস্থল ধ্বংসের উদ্যোগ নিতে হবে।

বর্ষায় কেন বাড়ে এডিস?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, বর্ষাকালে থেমে থেমে বৃষ্টি ও বাতাসের আর্দ্রতা এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। বৃষ্টির সময় পূর্ণবয়স্ক এডিস মশা গাছের পাতা, ঝোপঝাড় কিংবা ঘরের বিভিন্ন নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। বৃষ্টি থামার পর আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, উপযুক্ত পরিবেশ পেলে এডিসের জীবনচক্র দ্রুত সম্পন্ন হয়। জমে থাকা পানিতে ডিম থেকে লার্ভা এবং পরে পূর্ণাঙ্গ মশা তৈরি হয়। ভাইরাসবাহক মশা একজন আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানোর পর অন্য সুস্থ মানুষকে কামড়ালে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।

এ কারণে ডেঙ্গু রোগী দ্রুত শনাক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের বিশেষ নজরদারিতে রাখা এবং একই সঙ্গে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা—দুই কাজ একসঙ্গে চালাতে হবে।

শুধু হাসপাতাল বাড়িয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হলেও সেটি মূল সমাধান নয়। রোগী হাসপাতালে আসার আগেই যদি সংক্রমণ কমানো যায়, তাহলে চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপও কমবে।

এ জন্য নিয়মিত বাড়িঘর ও আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করে জমে থাকা পানি অপসারণ, নির্মাণাধীন ভবনে নজরদারি, বৃষ্টির পর দ্রুত পানি নিষ্কাশন, মশার প্রজননস্থল চিহ্নিতকরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যকর মশকনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানো দরকার।

একই সঙ্গে ডেঙ্গুর লক্ষণ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে। বিশেষ করে জ্বর কমার পরও রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখার বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার করা জরুরি।

সামনে সমন্বিত প্রস্তুতির সময়

ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, এটি আর শুধু মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ, অপরিকল্পিত নির্মাণ, পানি নিষ্কাশনের দুর্বলতা এবং এডিসের বিস্তারের কারণে ডেঙ্গু দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে।

তাই সামনে সম্ভাব্য সংক্রমণ বৃদ্ধির আগে হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে মশকনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।

চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর বড় একটি অংশ সময়মতো রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু না করার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, ঝুঁকির লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া এবং জ্বর কমে যাওয়ার পরও সতর্ক থাকা জরুরি।

সবশেষে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মূল দায়িত্ব শুধু সিটি করপোরেশন, হাসপাতাল বা সরকারের একার নয়। এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংস, রোগীকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা এবং সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা—এই তিনটি কাজ একসঙ্গে করা গেলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

বর্তমানে আক্রান্ত ২৫ হাজার ছাড়িয়েছে, মৃত্যু ৭৪। সামনে বর্ষার আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাস। তাই এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ডেঙ্গুর বিস্তার আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কাই করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!