ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার নতুন সংকট: একাদশেই হারিয়ে গেল সাড়ে পাঁচ লাখ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ৮, ২০২৬, ০১:৩৭ পিএম

শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার নতুন সংকট: একাদশেই হারিয়ে গেল সাড়ে পাঁচ লাখ

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে কমতে থাকা শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক—সব স্তরেই ঝরে পড়ার প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে। ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগেই একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) এবং বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সাল থেকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার প্রবণতা নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে। ২০২৩ সালে এ হার ছিল ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০২৩ সালে মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ছিল ৩২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিকে এ হার ২১ দশমিক ৫১ শতাংশ।

 

একাদশে নিবন্ধন করেও পরীক্ষার বাইরে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ

২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার্থীরা ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল। ওই শিক্ষাবর্ষে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিল ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন।

অর্থাৎ ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন, বা ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ নিবন্ধিত শিক্ষার্থী ফরম পূরণই করেনি। ফলে তারা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হারিয়েছে।

মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। আলিম প্রথম বর্ষে নিবন্ধিত ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে ফরম পূরণ করেছে ৭৮ হাজার ২৬৯ জন। ফরম পূরণ করেনি ৬১ হাজার ৬৬০ জন, যা মোট নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর ৪৪ দশমিক ০৭ শতাংশ।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। একাদশ শ্রেণির ভোকেশনাল শাখায় নিবন্ধিত ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ শিক্ষার্থীর মধ্যে ফরম পূরণ করেছে ৭৫ হাজার ১৯৭ জন। বাদ পড়েছে ৯০ হাজার ৩৪৫ জন। এ বোর্ডে ফরম পূরণ না করা শিক্ষার্থীর হার ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

সব মিলিয়ে তিন ধারায় একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেও প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার বাইরে চলে গেছে।

প্রথম দিনেই অনুপস্থিত প্রায় ২৫ হাজার

শুধু ফরম পূরণ না করাই নয়, চলমান এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রথম দিনেও প্রায় ২৫ হাজার পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দিন মোট ২৪ হাজার ৭৮৪ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ১৭ হাজার ২৩৩ জন, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৪ হাজার ৪৭৮ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৩ হাজার ৭৩ জন অনুপস্থিত ছিল।

শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের মতে, নিবন্ধনের পর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ না করা এবং পরীক্ষার দিন অনুপস্থিত থাকার ঘটনা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রাথমিকেও উল্টো স্রোত প্রাথমিক স্তরেও দীর্ঘদিন ধরে কমতে থাকা ঝরে পড়ার হার আবার বেড়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

২০২৪ সালে প্রাথমিক স্তরে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার ছিল ১৯ দশমিক ০২ শতাংশ। মেয়েদের ক্ষেত্রে এ হার ১৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

অন্যদিকে, ব্যানবেইসের বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ৩২ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিকে ২১ দশমিক ৫১ শতাংশ।

মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার ৩৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ, যেখানে ছেলেদের হার ৩০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। ফলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে মেয়েদের ঝরে পড়ার পেছনে বাল্যবিবাহ ও পারিবারিক দায়িত্বের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

দুর্যোগেও ঝরে পড়ছে হাজারো শিক্ষার্থী

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ুজনিত ক্ষতিও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কলেজ থেকে ১ লাখ ২ হাজার ১৫ জন শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। তাদের মধ্যে ৬২ হাজার ৩০৮ জনই মেয়ে, যা মোট ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর ৬১ দশমিক ০৮ শতাংশ।

দারিদ্র্য, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ বড় কারণ

শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের মতে, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে—দারিদ্র্য, পারিবারিক আর্থিক সংকট, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিদ্যালয়ে যাতায়াতের সমস্যা, শিক্ষার মান ও শেখার আগ্রহ কমে যাওয়া এবং অভিভাবকদের অনাগ্রহ।

শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরীর মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা, দীর্ঘ সময়ের শিক্ষাব্যাঘাত এবং শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপর পড়েছে। মাধ্যমিকের পর উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার আগেই অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। আবার একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধনের পরও অনেকে পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে কিংবা পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না।

তিনি বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধিকে ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে অবৈতনিক শিক্ষা চালুর ওপর গুরুত্ব দেন।

শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, কোভিড-১৯-এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং অর্থনৈতিক সংকটে অনেক পরিবারের আয় কমেছে। শিক্ষা ব্যয়, কোচিং ও পরীক্ষা প্রস্তুতির খরচ বহন করতে না পেরে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে ছিটকে পড়ছে।

তার মতে, ঝরে পড়া রোধে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের জন্য উপবৃত্তি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও জোরদার করার পাশাপাশি শিক্ষাকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে।

ঝরে পড়া ঠেকাতে সরকারের নানা উদ্যোগ

শিক্ষার্থী ঝরে পড়া কমাতে সরকার উপবৃত্তি, স্কুল ফিডিং কর্মসূচি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, স্কুল ড্রেস, জুতা-মোজা প্রদান এবং ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেওয়ার মতো বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়া কমাতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই, উপবৃত্তি, স্কুল ফিডিং এবং শিক্ষার্থীদের পোশাক ও জুতা-মোজা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধনের পরও পরীক্ষার বাইরে চলে যাওয়ার তথ্য বলছে, বিদ্যমান সহায়তা কর্মসূচির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, শিক্ষার পরিবেশ, মানসম্মত পাঠদান এবং বিদ্যালয়ের সঙ্গে তাদের পুনরায় যুক্ত করার বিষয়ে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া শুধু শিক্ষা খাতের সংকট নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক উন্নয়নের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!