মেহেরপুর জেলার একটি ছোট্ট গ্রাম দফরপুর। সীমিত সুযোগ-সুবিধার সেই জনপদ থেকেই এক তরুণের স্বপ্নপূরণের গল্প এখন ছড়িয়ে পড়ছে আন্তর্জাতিক শিক্ষাঙ্গনে। দৃঢ় সংকল্প, কঠোর পরিশ্রম এবং উচ্চশিক্ষার প্রতি অদম্য আগ্রহের মাধ্যমে ইউরোপের মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন মঈনউদ্দীন পলাশ।
মেহেরপুর সদর উপজেলার দফরপুর গ্রামের বাসিন্দা মঈনউদ্দীন পলাশ, পিতা আব্দুল মতিন। ছোটবেলা থেকেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে বাংলাদেশ থেকে পাড়ি জমান ইউরোপের দেশ চেক প্রজাতন্ত্রে।
বিদেশে নতুন পরিবেশ, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষাগত সীমাবদ্ধতা এবং সম্পূর্ণ আলাদা শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া ছিল তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে নিরলস অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি এগিয়ে যান নিজের লক্ষ্যের দিকে।

সম্প্রতি তিনি চেক প্রজাতন্ত্রের University of Technology and Economics in České Budějovice (VŠTE) থেকে Master`s in Logistics ডিগ্রি সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি আধুনিক সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যবস্থা, লজিস্টিক সিস্টেম, এয়ার লজিস্টিক্স এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। একাডেমিক উৎকর্ষতা, গবেষণার প্রতি আগ্রহ এবং বিশ্লেষণধর্মী কাজের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকদের প্রশংসা অর্জন করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, তাঁর গবেষণামূলক কাজ ও একাডেমিক ফলাফলে সন্তুষ্ট হয়ে শিক্ষকরা ভবিষ্যতে উচ্চতর গবেষণায় অংশগ্রহণের জন্য তাঁকে উৎসাহিত করেন। এরই ধারাবাহিকতায় স্লোভাকিয়ার University of Žilina-এ পিএইচডি গবেষণার সুযোগ তাঁর সামনে উন্মুক্ত হয়েছে, যা তাঁর একাডেমিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে মঈনউদ্দীন পলাশ বলেন, "বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথ কখনোই সহজ ছিল না। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, পড়াশোনার চাপ এবং নানা বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। কিন্তু আত্মবিশ্বাস হারাইনি। পরিবার, শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুপ্রেরণাই আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস দিয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গড়ার জন্য নয়; বরং দেশের উন্নয়ন, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ভবিষ্যতে লজিস্টিক্স, পরিবহন ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে গবেষণার মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিসরে অবদান রাখতে চাই।"
শিক্ষাবিদদের মতে, বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে লজিস্টিক্স ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এ খাতে দক্ষ মানবসম্পদের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ফলে মঈনউদ্দীন পলাশের মতো তরুণ গবেষকদের সাফল্য বাংলাদেশের জন্যও ইতিবাচক সম্ভাবনার বার্তা বহন করে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দফরপুর গ্রামের এই তরুণের অর্জন শুধু তাঁর পরিবারের জন্য নয়, গোটা মেহেরপুর জেলার জন্যই গর্বের বিষয়। তাঁর এই সাফল্য দেশের অসংখ্য তরুণ-তরুণীকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং গবেষণায় এগিয়ে যেতে নতুন করে অনুপ্রাণিত করবে।
ছোট্ট একটি গ্রাম থেকে শুরু হওয়া পথচলা আজ ইউরোপের আন্তর্জাতিক শিক্ষাঙ্গনে পৌঁছেছে। মঈনউদ্দীন পলাশের এই সাফল্যের গল্প প্রমাণ করে—স্বপ্ন যদি বড় হয় এবং সেই স্বপ্ন পূরণে অধ্যবসায় থাকে, তবে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কখনোই সাফল্যের পথে বাধা হতে পারে না।

