ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

"ভিসি নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবের বিতর্ক, প্রশ্নে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ"

স্টাফ রিপোর্টার | ঢাকা

প্রকাশিত: আগস্ট ৬, ২০২৬, ১২:৫০ পিএম

ছবিঃ সংগৃহীত

সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য (ভিসি) পরিবর্তনের ঘটনা যেন এক অলিখিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতিটি সরকার পরিবর্তনের পরই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সর্বোচ্চ একাডেমিক ও প্রশাসনিক পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে বারবার সামনে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—উপাচার্য নিয়োগ কি সত্যিই যোগ্যতা ও একাডেমিক নেতৃত্বের ভিত্তিতে হচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক বিবেচনাই হয়ে উঠছে প্রধান নিয়ামক?

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এবং পরবর্তীতে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরও একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে সেই পুরোনো বিতর্ক আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। শিক্ষাবিদদের একাংশ বলছেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভিসি পরিবর্তনের এই প্রবণতা দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগজনক।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাপক পরিবর্তন

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের মুখে একের পর এক উপাচার্য পদত্যাগ করেন। সে সময় অনেকেই অভিযোগ করেছিলেন, আন্দোলন ও জনচাপের মুখে বা তথাকথিত ‘মবের চাপে’ অনেক উপাচার্যকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। বিষয়টি দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তত ৩০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদত্যাগ করেন। পরে রাষ্ট্রপতি একযোগে ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে আরও পদত্যাগ ও নতুন নিয়োগের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মোট ৪৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন উপাচার্যও পদত্যাগ করেন অথবা তাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর আবারও নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।

আইনে কী বলা আছে?

বাংলাদেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে রাষ্ট্রপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে, উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে থাকেন। তবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না।

উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইনে সিনেটের মনোনীত তিন সদস্যের প্যানেল থেকে আচার্য একজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেন। অন্যদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক প্রতিষ্ঠানের আইনে আচার্য সরাসরি উপাচার্য নিয়োগের ক্ষমতা রাখেন।

ফলে দেশে এখনো উপাচার্য নিয়োগের জন্য অভিন্ন আইন বা একক নীতিমালা গড়ে ওঠেনি।

সার্চ কমিটির দাবি বহুদিনের

শিক্ষাবিদদের মতে, উপাচার্য নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন সার্চ কমিটি গঠন করা জরুরি।

১৯৯১ সালের শিক্ষা টাস্কফোর্স, ২০০৩ সালের শিক্ষা কমিশন এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বিভিন্ন কৌশলগত পরিকল্পনায়ও সার্চ কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছিল।

তাদের মতে, বর্তমান ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ থেকে যায় এবং যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে কীভাবে নিয়োগ হয়

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিশ্বের অনেক দেশে উপাচার্য নিয়োগের আগে উন্মুক্তভাবে আবেদন আহ্বান করা হয়।এরপর স্বাধীন সার্চ বা সিলেকশন কমিটি আবেদনকারীদের জীবনবৃত্তান্ত, গবেষণা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মূল্যায়ন করে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক, সিনেট, বোর্ড অব ট্রাস্টিজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় কাউন্সিলও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।

বাংলাদেশে কেন বিতর্ক? বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ শিক্ষক, শিক্ষক সংগঠনের নেতা কিংবা রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

যদিও সরকারগুলো বরাবরই দাবি করে এসেছে, নিয়োগে একাডেমিক যোগ্যতা, গবেষণা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। 

রাশেদা কে চৌধূরী: ‘দল নয়, যোগ্যতাই হোক প্রধান বিবেচনা’

শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরী বলেন,

"রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের এই প্রবণতা আমরা প্রায় সব সরকারের সময়ই দেখেছি। বর্তমান সরকার যদি সত্যিই দল-মতের ঊর্ধ্বে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে, তাহলে তার প্রতিফলন নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও দেখা উচিত।"

তিনি বলেন, একজন উপাচার্যের মধ্যে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, দীর্ঘ একাডেমিক অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক নেতৃত্ব, আর্থিক সুশাসন, ব্যক্তিগত সততা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা থাকা প্রয়োজন।

তার মতে, উন্মুক্ত আবেদন, নির্ধারিত যোগ্যতার মানদণ্ড প্রকাশ এবং স্বাধীন সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ দিলে বিতর্ক অনেকটাই কমে আসবে।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতে, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের বিতর্ক নতুন নয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আন্দোলনের মুখে উপাচার্যদের পদত্যাগ এবং পরবর্তীতে দ্রুত নতুন নিয়োগের ঘটনাও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

একজন সাবেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,

"দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ হওয়া যতটা বড় বিষয় নয়, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে কি না। আর নিয়োগ পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা হচ্ছে কি না।"

ইউজিসির বক্তব্য

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে উপাচার্য নিয়োগে দলীয় বিবেচনার অভিযোগ আইনগতভাবে প্রমাণ করা সহজ নয়।

তার ভাষায়,

"সরকারের লক্ষ্য ছিল সবচেয়ে যোগ্য শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া। যোগ্যতার বিষয়টি আপেক্ষিক হলেও বর্তমান বাস্তবতায় যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তারা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় সক্ষম এবং দক্ষ বলে আমরা মনে করি।"

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার জ্ঞানভিত্তিক, দক্ষতাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম ব্যক্তিদেরই উপাচার্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।

উচ্চশিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় দেশের জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র। তাই উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে একাডেমিক উৎকর্ষ, গবেষণা, প্রশাসনিক দক্ষতা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও নৈতিক নেতৃত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

তাদের মতে, একটি স্বাধীন সার্চ কমিটি, উন্মুক্ত আবেদন, যোগ্যতার প্রকাশ্য মানদণ্ড এবং স্বচ্ছ মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা গেলে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক অনেকটাই কমে আসবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনও আরও শক্তিশালী হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!